কলকাতা, ২০ জুনঃ ভোটের আগে বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে ‘শ্যামাপ্রসাদের বাংলা’ গড়ার অঙ্গীকার করেছিলেন, বিজেপি শিবিরের দাবি, তারই রাজনৈতিক বাস্তবায়ন ঘটেছে গত ৪ মে। ফলতা-সহ মোট ২০৮টি আসন জিতে প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। আর সেই পালাবদলের পরই এ বছর প্রথমবার সরকারি মর্যাদায়, মহাসাড়ম্বরে পালিত হল পশ্চিমবঙ্গ দিবস। ২০ জুনের এই উদ্যাপন ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এক্স হ্যান্ডেলে পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে শুধুমাত্র শুভেচ্ছা বার্তাতেই থেমে থাকেননি শুভেন্দু প্রাক্তন তৃণমূল সরকারকে নিশানা করে ইতিহাস, আত্মপরিচয় এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে এক্স হ্যান্ডলে করা পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী লিখেছেন, বিগত সরকার নিজেদের ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি ও তোষণের স্বার্থে এই ‘পবিত্র’ দিনের গুরুত্বকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ইতিহাস এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের লড়াইকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল, যাতে মানুষ নিজের শিকড় এবং পশ্চিমবঙ্গ গঠনের নেপথ্যের প্রকৃত নায়কদের ভুলে যান। শুভেন্দুর কথায়, “সত্যকে কখনও চিরতরে চাপা দেওয়া যায় না। আমাদের সরকার সেই ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন করে বাংলার প্রকৃত ইতিহাসকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করেছে।” এখানেই থামেননি তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, “শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় না থাকলে ভারতের মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ নামক কোনও রাজ্যের অস্তিত্বই থাকত না।”
শুভেন্দুর এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই ২০ জুনকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নে রাজ্যে মতবিরোধ ছিল। বিজেপি শিবির বহু বছর ধরেই এই দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করে এসেছে। ২০১৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ নামে একটি চিন্তাগোষ্ঠী প্রথম ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করে। পরে বিজেপির উদ্বাস্তু সেল নিয়মিতভাবে দলীয় কার্যালয়ের সামনে দিনটি উদ্যাপন শুরু করে। ২০২১ সাল থেকে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও বিধায়কদের নিয়ে কলকাতার ময়দানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তির পাদদেশে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করতেন।
অন্যদিকে, তৎকালীন তৃণমূল সরকার ২০ জুনকে রাজ্য দিবস হিসেবে মান্যতা দিতে রাজি হয়নি। বরং পয়লা বৈশাখকে ‘রাজ্য দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরেও তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক বিতর্ক কম হয়নি। বাম শিবিরের একাংশও ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে মানতে আপত্তি জানিয়েছিল। ফলে ২০ জুন বনাম পয়লা বৈশাখ এই দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে বিতর্কের বিষয় হয়ে থেকেছে।
এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলেছে। বিজেপি বাংলার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবার সরকারি পরিসরে, বড় মাপের আয়োজনে পালিত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ দিবস। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এক্স হ্যান্ডলে বঙ্গবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্য ও বৈভব পুনরুদ্ধারের পথ আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
সব মিলিয়ে, এ বছরের পশ্চিমবঙ্গ দিবস আর শুধুমাত্র একটি প্রতীকী অনুষ্ঠান নয় এটি হয়ে উঠেছে বাংলার রাজনৈতিক পালাবদল, ইতিহাসের ব্যাখ্যা, আত্মপরিচয়ের দাবি এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ঘিরে বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের এক বড় প্রকাশ। ফলে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের এই উদ্যাপন আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে আরও বড় বিতর্ক ও মেরুকরণের ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।






