কলকাতা, ২০ জুনঃ তৃণমূল বিধায়কদের সই জাল কাণ্ডে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন মোড় নিচ্ছে রাজ্যের রাজনীতি। এবার এই বহুচর্চিত মামলায় তৃণমূলের প্রবীণ নেতা তথা বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের ভবানীপুরের বাড়িতে পৌঁছল সিআইডি। শনিবার সকালে তাঁর বাড়িতে হাজির হন সিআইডির ছয় আধিকারিক। জানা গিয়েছে, এদিন তদন্তকারীদের নিজের বাড়িতে আসতে বলেছিলেন শোভনদেব নিজেই। মূলত তৃণমূলের রেজোলিউশনের কপি খুঁজতেই এই সফর বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীদের হাতে সেই রেজোলিউশনের কপি তুলে দেন প্রবীণ তৃণমূল নেতা। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, সইয়ের দিন একজন বাদে তৃণমূলের প্রায় সব বিধায়কই উপস্থিত ছিলেন। একইসঙ্গে নাম না করে বিদ্রোহী শিবিরের বিরুদ্ধে ‘চক্রান্ত’-এর অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
শনিবার শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের ভবানীপুরের বাড়িতে প্রায় ঘণ্টাখানেক ছিলেন সিআইডি আধিকারিকরা। তদন্তকারীদের হাতে তিনি রেজোলিউশনের কপি তুলে দেন। এরপর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে খুব বেশি কথা না বললেও স্পষ্ট বার্তা দেন প্রবীণ তৃণমূল নেতা। তাঁর বক্তব্য, “কোর্টে কেস আছে। আমি একটা শব্দও বলব না। তবে ২০০ শতাংশ সহযোগিতা করেছি। আগামী দিনেও করব। এর বেশি কিছু বলার নেই। তবে এ সব যাঁরা করেছেন, বিশেষ ইন্টারেস্ট নিয়ে এসেই করেছেন।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
শুধু তাই নয়, এদিন নাম না করে বিদ্রোহী বিধায়কদের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেও নিশানা করেন শোভনদেব। তাঁর দাবি, যাঁরা পরে স্পিকারের কাছে অভিযোগ জানাতে গিয়েছেন, তাঁরাই এই জাল সইয়ের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। শোভনদেব বলেন, “আমরা সকলকে বিশ্বাস করে মিটিংয়ে ডেকেছিলাম। যাঁরা জাল সইটা করে দিয়েই সোজাসুজি স্পিকারের কাছে গিয়েছেন, তাঁরাই এগুলো করে দিয়ে গিয়েছেন।” তাঁর এই বক্তব্য কার্যত তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের দিকে সরাসরি আঙুল তুলেছে।
উল্লেখ্য, তৃণমূল বিধায়কদের সই জাল কাণ্ড সামনে আসার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, একটি রেজোলিউশন কপিতে একাধিক তৃণমূল বিধায়কের সই জাল করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্দরে বড়সড় ভাঙন তৈরি হয়। দলের একাংশের বিধায়ক বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখান। বিদ্রোহী নেতাদের তরফে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলেও দাবি করা হয়। এমনকি বর্তমানে তাঁরাই রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি বলে রাজনৈতিক মহলে প্রচার শুরু হয়েছে। ফলে সই জাল কাণ্ড এখন শুধুমাত্র একটি আইনি তদন্তের বিষয় নয়, তা কার্যত শাসকদলের ভিতরের ক্ষমতার লড়াই এবং রাজনৈতিক পুনর্গঠনের বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এই মামলার তদন্তে ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করেছে সিআইডি। তৃণমূলের কালীঘাটের কার্যালয়ে গিয়েও রেজোলিউশনের কপি খোঁজা হয়েছে। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জেরা করা হয়েছে। একই মামলায় তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ ও নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কয়েক দিন আগে সিআইডি অফিসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কুণাল ঘোষকে মুখোমুখি বসিয়েও জেরা করা হয়। এর আগে ১১ এবং ১৭ তারিখেও শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।
সব মিলিয়ে, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে সিআইডির এই সফর সই জাল কাণ্ডের তদন্তে নতুন তাৎপর্য যোগ করল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একদিকে প্রবীণ তৃণমূল নেতার সহযোগিতার বার্তা, অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরের বিরুদ্ধে তাঁর ‘চক্রান্ত’-এর অভিযোগ দুই মিলিয়ে তৃণমূলের অন্দরের সংঘাত যে এখনও থামেনি, তা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল।






