কলকাতা, ২০ জুনঃ দিল্লি সফর সেরে কলকাতায় ফেরার পথে দমদম বিমানবন্দরে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চড়েছে পারদ। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবার সরাসরি বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার সোশাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি দাবি করেন, দমদম বিমানবন্দরের ওই অশান্তি কোনও আকস্মিক বিক্ষোভ ছিল না, বরং এর নেপথ্যে ছিল সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক যোগসাজশ। একইসঙ্গে তাঁর কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হলেও তা সফল হবে না বলেও স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ।
শনিবার নিজের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডলে একটি ভিডিও শেয়ার করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ভিডিওতে হলুদ পোশাক পরা এক যুবককে দেখা যায়, যার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র সদৃশ বস্তু রয়েছে বলে দাবি তৃণমূলের। অভিষেকের অভিযোগ, ওই যুবকের নাম উত্তম দাস। তিনি দমদমের বাসিন্দা এবং স্থানীয় বিজেপি নেতা। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের আরও দাবি, সম্প্রতি কাঁথির শান্তিকুঞ্জের সামনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে শুভেচ্ছা জানাতে ব্রোঞ্জের চিতা হাতে উপস্থিত থাকতে দেখা গিয়েছিল এই উত্তম দাসকে। সেই সূত্র টেনেই অভিষেক কার্যত বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে ওই ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এই ভিডিও পোস্ট করে অভিষেক প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর নিরাপত্তা নিয়েও। তিনি দাবি করেছেন, যে ভাবে বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় একটি পরিকল্পিত বিক্ষোভ এবং হামলার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “কোনও পরিকল্পিত হামলা বা চক্রান্ত করে আমার কণ্ঠরোধ করা যাবে না।” রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বিজেপিকে সরাসরি নিশানা করেছেন অভিষেক, তেমনই নিজের রাজনৈতিক অবস্থানও আরও আক্রমণাত্মকভাবে স্পষ্ট করেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার দিল্লিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কলকাতায় ফেরার কথা ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তার আগেই দমদম বিমানবন্দরে জড়ো হন একদল বিজেপি সমর্থক। অভিযোগ, তাঁরা ডিম হাতে অভিষেকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিমানবন্দরে পৌঁছে যান তৃণমূল সমর্থকরাও। প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে হাতাহাতি এবং মারামারির পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বিমানবন্দর চত্বরে হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি এবং চিৎকারে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। যাত্রীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত সেখানে পৌঁছয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। দুই দলের সমর্থকদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়। গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এনএসসিবিআই থানার পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৫ জন তৃণমূল কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ দমদম পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে ফুচু, যিনি রাজনৈতিক মহলে রাজ্যের মন্ত্রী ব্রাত্য বসুর ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত।
সব মিলিয়ে, দমদম বিমানবন্দরের এই ঘটনা এখন আর শুধুমাত্র একটি বিক্ষোভ বা সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা কার্যত শাসক-বিরোধী রাজনৈতিক সংঘাতের নতুন পর্বে পরিণত হয়েছে। একদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজেপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ‘চক্রান্ত’-এর অভিযোগ, অন্যদিকে পুলিশের তদন্ত ও গ্রেফতারি সব মিলিয়ে বিমানবন্দর-কাণ্ড আগামী কয়েক দিন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে থাকবেই বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।






