নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: এক সময় ‘বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন’ ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের অন্যতম মুখ্য প্রদর্শনী। শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এই ত্রয়ীর প্রতিশ্রুতি নিয়েই প্রতি বছর ঘটা করে আয়োজন হত বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট (বিজিবিএস)। মঙ্গলবার সেই সম্মেলনকেই বিধানসভায় দাঁড়িয়ে দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পূর্ণাঙ্গ বাজেট নিয়ে আলোচনার মাঝেই তিনি সরাসরি অভিযোগ করলেন, বিজিবিএসের নামে ‘বিরাট দুর্নীতি’ হয়েছে। এমনকী আইনকে পাশ কাটিয়ে বণিকসভা ফিকিকে ৩২৪ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগের নিশানায় সরাসরি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মঙ্গলবার বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে উঠে শুভেন্দু হাতে একটি ফাইল তুলে ধরেন। বিরোধী বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে তাঁর প্রশ্ন, “আপনাদের নেত্রী কী কী কাণ্ড ঘটিয়েছেন দেখবেন? বিজিবিএস… খুব বড় বড় কথা বলেন না! ৩২৪.৭৩ কোটি টাকা ফিকিকে দিয়েছেন।” শুধু অভিযোগেই থামেননি তিনি। ওই ফাইলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষর রয়েছে বলেও দাবি করেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, “এটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র।” অর্থাৎ, বিজিবিএস-কে ঘিরে দুর্নীতির পরিমাণ এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে এমন ইঙ্গিতই দেন তিনি।
শুভেন্দুর এই আক্রমণ অবশ্য এক দিনের নয়। কয়েক দিন আগেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন আয়োজনের নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাকে মোট ৬৩৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। সেই অর্থ বরাদ্দ ও খরচের হিসাব খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানিয়েছিলেন। মঙ্গলবার বিধানসভায় তাঁর বক্তব্যে সেই অভিযোগ আরও নির্দিষ্ট রূপ পেল। এ দিন তিনি দাবি করেন, বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট যেহেতু সরকার পরিচালিত কর্মসূচি ছিল, তাই কোনও বেসরকারি সংস্থাকে এত বিপুল অর্থ কী প্রক্রিয়ায় এবং কোন নিয়মে দেওয়া হল, সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে কিছুটা কটাক্ষের সুরেই শুভেন্দু বলেন, “জানতে চাইছেন কিছু প্রাক্তন মেয়র?” রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই মন্তব্যে তিনি প্রাক্তন মেয়র তথা তৃণমূলের একাধিক নেতাকে খোঁচা দিতেই চেয়েছেন। তবে তাঁর আক্রমণের মূল কেন্দ্র ছিল মমতা জমানার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। শুভেন্দুর অভিযোগ, বিজিবিএসের নামে শিল্প সম্মেলনের আবরণে যে বিপুল আর্থিক লেনদেন হয়েছে, তার নেপথ্যে স্বচ্ছতা ছিল না।
তৃণমূল জমানায় বিজিবিএসকে বারবার ‘বাংলার বিনিয়োগের জানালা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। দেশ-বিদেশের শিল্পপতি, কূটনীতিক, বণিকসভা সকলের উপস্থিতিতে সেটিকে রাজ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের বড় মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করত নবান্ন। সেই প্রকল্প নিয়েই এ বার দুর্নীতির অভিযোগ তুললেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। ফলে রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। কারণ, শিল্প ও বিনিয়োগের প্রশ্নে মমতা সরকারের অন্যতম প্রচারিত মুখকেই এখন দুর্নীতির অভিযোগের কাঠগড়ায় তুলছে নতুন সরকার।
অবশ্য শুভেন্দুর এই অভিযোগের জবাবে তৃণমূলের তরফে কী প্রতিক্রিয়া আসে, সেটাই এখন দেখার। কিন্তু বাজেট-আলোচনার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিজিবিএসের ফাইল খুলে মুখ্যমন্ত্রীর এই আক্রমণ স্পষ্ট করে দিল, প্রাক্তন সরকারের আর্থিক সিদ্ধান্ত ঘিরে সংঘাত আগামী দিনে আরও তীব্র হতে চলেছে।





