নয়াদিল্লি, ৫ সেপ্টেম্বরঃ পুলিশের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। আবার অন্যায়ের শিকার সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের কাছেই প্রথম ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। সেই পুলিশের নিরপেক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই এবার প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানালেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। তাঁর বক্তব্য, পুলিশ যদি নিরপেক্ষতার জায়গা হারায় এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের পথ নেয়, তা হলে তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রাক্তন আইপিএস আধিকারিক যশোবর্ধন আজাদের লেখা ‘পোলিসিং দ্য রিপাবলিক’ বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিচারপতি ভূঁইয়া পুলিশের ভূমিকা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আন্দোলন-বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের আচরণ, হেফাজতে নির্যাতন এবং তদন্তের সময় মানবাধিকারের বিষয়টি।
বিচারপতির আক্ষেপ, প্রতিবাদী বা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের আধিকারিকদের ব্যক্তিগত ভাবে হাতাহাতি বা মারধরের দৃশ্য তাঁকে হতাশ করে। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ কখনও যেন প্রথম পন্থা হয়ে না ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করেও অনেক ক্ষেত্রে সমাধানের পথ খোঁজা সম্ভব।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য আরও বাড়ছে সাম্প্রতিক দিল্লির একটি বিক্ষোভকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষাপটে। অভিযোগ উঠেছিল, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস-সহ একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। মহিলা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়েও অভিযোগ ওঠে। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাবাহিনীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রও আদালত স্বীকার করেছে।
একই সঙ্গে হেফাজতে মৃত্যু ও জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনের মতো বিষয় নিয়েও সরব হয়েছেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তাঁর বক্তব্যের সারকথা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত কোনও সভ্য সমাজে তদন্ত বা জিজ্ঞাসাবাদের নামে নিষ্ঠুরতার কোনও জায়গা থাকতে পারে না।
পুলিশের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার জায়গাটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, রাস্তায় ইউনিফর্ম পরা পুলিশকর্মী অনেকের কাছেই রাষ্ট্রশক্তির দৃশ্যমান প্রতীক। কোনও নাগরিক অন্যায়ের শিকার হলে সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছেই তিনি সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের আশায় যান। ফলে পুলিশের প্রতি আস্থা বজায় রাখা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশের দায়িত্বও কম নয়। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হিংসা ছড়ানো আটকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রশাসনকে নিতেই হয়। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের সীমারেখা কোথায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও বিচারপতির মন্তব্য সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
ফলে পুলিশের সংস্কার নিয়ে বিচারপতি ভূঁইয়ার বক্তব্য শুধুমাত্র বাহিনীর আচরণ নিয়ে সমালোচনা নয়, বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মৌলিক প্রশ্নও তুলে ধরেছে। পুলিশের শক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন তার নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত কতটা অটুট থাকে, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।





