নিজস্ব সংবাদদাতা, কোচবিহার: জন্মাষ্টমীর পরের দিন। মন্দির চত্বরে তখন উৎসবের আমেজ। কোথাও ভক্তদের ভিড়, কোথাও ঢাক-ঢোলের আওয়াজ। তারই মধ্যে কাদা, দুধ আর মধু মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে এক বিশেষ খেলার ময়দান। শুরু হল প্রতিযোগিতা। কেউ কাদার মধ্যে হাতড়ে খুঁজছেন ফল, কেউ আবার লুকিয়ে রাখছেন সেই ফল। দৃশ্যটা আধুনিক সময়ের নয়, যেন ফিরে যাওয়া কয়েক শতক আগের রাজ আমলে।
কোচবিহারের মদনমোহন বাড়িতে এ ভাবেই রাজ আমলের ঐতিহ্য ও রীতি মেনে পালিত হল দধি কাঁদো খেলা। জন্মাষ্টমীর পরের দিনের এই বিশেষ আয়োজন ঘিরে এ দিন মন্দির চত্বরে ছিল উৎসবের আবহ। দর্শনার্থীদের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রথা মেনে মন্দিরের সামনে তৈরি করা হয় কাদার আসর। সেই কাদায় মেশানো হয় দুধ ও মধু। এর পর দু’টি দলের মধ্যে শুরু হয় মূল প্রতিযোগিতা। একটি দল কাদার মধ্যে পাঁচটি ফল লুকিয়ে দেয়। অন্য দলের কাজ সেই ফল খুঁজে বার করা। কাদা ঘেঁটে ফল উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উচ্ছ্বাস, হাসি-ঠাট্টা এবং দর্শকদের উৎসাহ। শেষ পর্যন্ত বিজয়ী দলের হাতে তুলে দেওয়া হয় আর্থিক অনুদান।
তবে উৎসবের এই আয়োজন নিছক খেলা নয়। কোচবিহারের রাজপরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আজও এই রীতির মধ্যে বেঁচে রয়েছে। সময় বদলেছে, বদলেছে প্রশাসনিক কাঠামো, সামাজিক পরিসরও। কিন্তু মদনমোহন বাড়ির দধি কাঁদো এখনও সেই পুরনো স্মৃতির ধারক।
উৎসব ঘিরে ভিড় বাড়ায় স্বাভাবিক ভাবেই নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো থেকে শুরু করে মন্দির চত্বরে নিরাপত্তা সব দিকেই নজর থাকে প্রশাসনের। ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে দিকটিও থাকে নজরে।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ বা আইনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে এই আয়োজনের মূল সুর অবশ্য একটাই উৎসবের সঙ্গে ইতিহাসের মেলবন্ধন। রাজ আমলের সেই খেলাই আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিচ্ছে কোচবিহারের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়। কাদা শুকিয়ে যায়, উৎসব শেষ হয়। কিন্তু কিছু ঐতিহ্য থেকে যায় পরের বছরের অপেক্ষায়।





