কলকাতা, ৯ জুলাইঃ হাসপাতালে দালালচক্র ভাঙতে এ বার সরাসরি নজরদারির পথে রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার সকালে কোনও পূর্বঘোষণা ছাড়াই স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছে নতুন কন্ট্রোল রুম পরিদর্শন করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখান থেকেই রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির পরিষেবা, নিরাপত্তা এবং পরিকাঠামোর উপর রিয়েল-টাইম নজরদারি চালানোর ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন তিনি। পরিদর্শনের শেষে কড়া বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, ‘‘কোনও দালালকে আজ হাসপাতালে দেখা গেলে কাল আর তাঁকে দেখা যাবে না।’’
নবান্নে যাওয়ার আগে আচমকাই স্বাস্থ্যভবনে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে নতুন মনিটরিং ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, স্বাস্থ্যভবনে তৈরি হওয়া কন্ট্রোল রুম থেকে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের উপর লাইভ নজরদারি শুরু হয়েছে। আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যের সমস্ত মহকুমা হাসপাতালও এই নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় চলে আসবে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, হাসপাতালে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য দীর্ঘদিনের সমস্যা। রোগীরা সাধারণত টানা দু’দিন হাসপাতালে আসেন না। ফলে একই ব্যক্তিকে যদি দিনের পর দিন হাসপাতাল চত্বরে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়, তবে তাঁকে সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। তাঁর দাবি, প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি হাসপাতালকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করে তুলবে।
শুধু দালাল দমন নয়, সরকারি হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিষেবা উন্নয়নেও জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর নির্দেশে হাসপাতালের কিচেন, ওয়ার্ড, করিডর থেকে শুরু করে পার্কিং লট—সবই নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। হাসপাতালের প্রতিটি স্তরে পরিষেবার মান বজায় থাকছে কি না, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে জানান তিনি।
রোগীদের খাবারের মান নিয়েও এ দিন গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, রোগীপিছু খাবারের বরাদ্দ ৫৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১০ টাকা করা হয়েছে। ফলে খাবারের গুণগত মানও উল্লেখযোগ্য ভাবে উন্নত হয়েছে। তাঁর কথায়, সরকারি হাসপাতালের উপর নির্ভর করেন মূলত প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষ। তাই তাঁদের জন্য উন্নত পরিষেবা নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে মন্তব্য করেন, ‘‘নেতা-মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যান না। তাই সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই এই পরিবর্তনের উদ্যোগ।’’
স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের ক্ষেত্রেও আরও শৃঙ্খলা আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা কর্মীদের জন্য আলাদা রঙের ব্যাজ চালু করা হবে। এর ফলে কোন কর্মীর দায়িত্ব কী, তা সহজে বোঝা যাবে। অনেক সময় দায়িত্বের গরমিল থেকে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সেই সমস্যা দূর করতেই এই উদ্যোগ বলে জানান তিনি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাসও দেন।
বড় দুর্ঘটনা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েও এ দিন একাধিক ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, তারাতলার মতো বিপর্যয়ের সময়ে দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম এমন আধুনিক ট্রমা সেন্টার গড়ে তোলা হবে, যেখানে মাত্র এক মিনিটে ২৫০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার ইউনিটে বেড এবং আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে স্বীকার করেন, রাজ্যে বার্ন ইউনিট পরিষেবা এখনও দুর্বল। সেই ক্ষেত্রেও পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নিউটাউনে আদানি গোষ্ঠীর উদ্যোগে ২ হাজার শয্যার একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল তৈরি হবে। তার মধ্যে এক হাজার শয্যা সংরক্ষিত থাকবে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য। খুব শীঘ্রই ওই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করে তোলার লক্ষ্যেই এই ধারাবাহিক পদক্ষেপ বলে সরকারের দাবি। আর সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, সরকারি হাসপাতালকে এমন জায়গায় পরিণত করতে হবে, যেখানে রোগী চিকিৎসা পাবেন নিশ্চিন্তে, আর দালালচক্রের কোনও জায়গা থাকবে না।





