শিলিগুড়ি, ২ আগস্টঃ উত্তরবঙ্গকে আধুনিক নগর উন্নয়নের নতুন মানচিত্রে তুলে ধরতে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করলেন রাজ্যের নগর উন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। রবিবার শিলিগুড়ি পুরনিগমে জনসংযোগ কর্মসূচি ও প্রশাসনিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ীকে পৃথক পুরসভা করা হবে, শিলিগুড়িকে গড়ে তোলা হবে ‘হিমালয়ান সিটি’ হিসেবে এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন শহরে পর্যায়ক্রমে আধুনিক নগর পরিষেবা চালু করা হবে।
কলকাতা থেকে বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছে সরাসরি শিলিগুড়ি পুরনিগমে যান মন্ত্রী। সেখানে কমিশনার বীর বিক্রম রাই ও প্রশাসকমণ্ডলীর সদস্য আর. বিমলা তাঁকে স্বাগত জানান। জনসংযোগ কর্মসূচিতে ফোনের মাধ্যমে নাগরিকদের অভিযোগ ও পরামর্শ শোনেন তিনি। পানীয় জল, নিকাশি, রাস্তা, পরিচ্ছন্নতা-সহ বিভিন্ন পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের। পরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন পুরসভার আধিকারিকদের নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনা বৈঠক করেন।
বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনে অগ্নিমিত্রা পাল জানান, দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ীকে পৃথক পুরসভা গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে। একইসঙ্গে শিলিগুড়িকে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম আধুনিক বাণিজ্যিক ও নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ‘হিমালয়ান সিটি’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
শহরের যানজট কমাতে দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের একাধিক শহরে মাল্টি-লেভেল পার্কিং নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। শিলিগুড়িতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে চালু হবে অ্যাপ-ভিত্তিক অনলাইন পার্কিং ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম ও পরিচয়পত্র ছাড়া কোনও পার্কিং কর্মী কাজ করতে পারবেন না। পাশাপাশি শহরে ওয়ান-সাইড পার্কিং চালুরও ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে যানজট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে প্রশাসনের আশা।
শহর পরিচ্ছন্ন রাখতেও কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি জানান, ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাস্তায় ময়লা বা থুতু ফেললে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে। নাগরিকদের ‘স্বচ্ছ’ মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোথাও আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখলে অ্যাপে ছবি আপলোড করলেই পুরনিগমের পক্ষ থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে তা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও নতুন উদ্যোগের ঘোষণা করেন অগ্নিমিত্রা। শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়িতে ভারত পেট্রোলিয়ামের সহযোগিতায় আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি মন্দিরে ব্যবহৃত ফুল পুনর্ব্যবহার করে ধূপকাঠি ও আবির তৈরির প্রকল্প শুরু হবে। প্রথম পর্যায়ে জলপেশ, কোচবিহারের মদনমোহন এবং ভার্মি দেবী মন্দিরে এই প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কোচবিহরের উন্নয়নের জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। একইসঙ্গে কোচবিহরকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। উত্তরবঙ্গের প্রতিটি শহরে আধুনিক বাসস্টপ নির্মাণ, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা, মোবাইল চার্জিং, বাসের রিয়েল-টাইম তথ্য এবং হ্যাঙ্গিং গার্ডেনের মতো সুবিধা থাকবে বলেও জানান।
পানীয় জল প্রকল্প নিয়েও বড় ঘোষণা করেন মন্ত্রী। তাঁর দাবি, ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে উত্তরবঙ্গের প্রতিটি বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যার জন্য প্রায় ১,৬৯৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে। পাশাপাশি মিরিকের জল প্রকল্পের তিনটি এসটিপি চলতি বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ হবে এবং মিরিক লেক সংলগ্ন এলাকার সৌন্দর্যায়নের কাজও শুরু হবে।
পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে উত্তরবঙ্গের বড় বাজারগুলিতে বিশেষ ভেন্ডিং মেশিন বসিয়ে ভুট্টা ও আনারসের তন্তু দিয়ে তৈরি ব্যাগ মাত্র এক টাকায় বিক্রির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি বস্তি এলাকায় কমিউনিটি টয়লেট এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণেরও ঘোষণা করেন।
মন্ত্রী বলেন, “প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক পরিষেবা, উন্নত অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন শহর এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গকে দেশের অন্যতম আধুনিক নগরাঞ্চলে পরিণত করাই আমাদের লক্ষ্য।” তাঁর এই একগুচ্ছ ঘোষণার পর উত্তরবঙ্গের নগর উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।





