কলকাতা, ৫ মেঃ ২০১১ সালে পরিবর্তনের ঢেউ তুলে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তারপর টানা ১৫ বছরের শাসন। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই পরিবর্তনের স্রোতই উল্টো পথে বইল। বিপুল জয়ের মাধ্যমে প্রথমবার বাংলার মসনদে বসতে চলেছে বিজেপি। প্রশ্ন উঠছে কেন এই বিপর্যয়? কোথায় ব্যর্থ হল শাসকদল?
সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে তীব্র প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ জমে। কিন্তু তৃণমূলের ক্ষেত্রে সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে নিচুতলার কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা দাদাগিরি, সিন্ডিকেট, কাটমানি ও তোলাবাজির অভিযোগে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতির একাধিক ইস্যু, যা সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
অন্যদিকে, বিজেপির উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ ধর্মীয় মেরুকরণ। রাজ্যে হিন্দুত্বের রাজনীতি ক্রমশ জোরালো হয়েছে। সিএএ-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে রামনবমী ঘিরে উত্তেজনা সবই একধরনের রাজনৈতিক আবহ তৈরি করেছে। বিজেপি দক্ষতার সঙ্গে তৃণমূলকে ‘হিন্দুবিরোধী’ ও ‘সংখ্যালঘু তোষণকারী’ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
এর পাশাপাশি সংখ্যালঘু ভোটও আর একমুখী থাকেনি। আইএসএফ, এআইএমআইএম, কংগ্রেস-সিপিএম সব মিলিয়ে ভোট ভাগাভাগি হয়েছে, যার সরাসরি লাভ পেয়েছে বিজেপি।
নির্বাচনে এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়েও বিতর্ক ছিল বড় ফ্যাক্টর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুললেও, সেই ইস্যুতে অতিরিক্ত জোর দেওয়ায় উন্নয়নমূলক প্রচার আড়ালে পড়ে যায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়া কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। নিয়োগ দুর্নীতি, চাকরি না পাওয়া, ডিএ-সংক্রান্ত অসন্তোষ সবমিলিয়ে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের একাংশ তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আরজি কর হাসপাতালের ঘটনাও জনমনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে মহিলা ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরার ইঙ্গিত মিলেছে। যদিও তৃণমূলের সামাজিক প্রকল্প যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী ছিল বড় হাতিয়ার, বিজেপির পালটা আর্থিক প্রতিশ্রুতি সেই প্রভাবকে অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
২০২১ সালের মতো ‘বাঙালি অস্মিতা’ ইস্যুও আর তেমন কাজ করেনি। বিজেপি এই সময়ের মধ্যে নিজেদের ‘বহিরাগত’ তকমা অনেকটাই ঝেড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। রাজ্য সভাপতি হিসেবে শমীক ভট্টাচার্য-র মতো বাঙালি মুখ সামনে আনা, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার চেষ্টা সবই এই ভাবমূর্তি বদলে সাহায্য করেছে। এমনকি নরেন্দ্র মোদি-র প্রচারেও দেখা গেছে স্থানীয় সংযোগের বার্তা।
সবশেষে, ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রত্যাশাও বড় ভূমিকা নিয়েছে। দীর্ঘদিন কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের কারণে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে এমন ধারণা সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। সেই জায়গায় পরিবর্তনের আশা থেকেই বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে ভোট।
সব মিলিয়ে, সংগঠনের ভাঙন, তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থতা এবং শক্তিশালী বিজেপি সংগঠনের মোকাবিলায় দুর্বলতা এই সমস্ত কারণ একসঙ্গে কাজ করেই তৃণমূলের পরাজয় এবং বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।





