নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: এ বারের বিধানসভা অধিবেশন এমন এক পরিস্থিতির সাক্ষী থাকতে চলেছে, যার নজির সাম্প্রতিক অতীতে মেলা ভার। বিরোধী দলে আড়াআড়ি ভাঙন, প্রতীক ও তহবিল নিয়ে দ্বন্দ্ব, বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি ঘিরে আদালতে টানাপড়েন সব মিলিয়ে ‘আসল’ তৃণমূল কারা, সেই প্রশ্নেই এখন কার্যত বিভক্ত বিরোধী শিবির। তারই সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে বিধানসভার গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলির গঠনে। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (পিএসি)-সহ চারটি কমিটির চেয়ারম্যান বাছতে এ বার ভোটাভুটির পথে হাঁটতে হচ্ছে বিধানসভাকে। আগামী ৫ জুলাই হবে সেই নির্বাচন।
বিধানসভা সূত্রের খবর, পিএসি ছাড়াও আরও তিনটি কমিটির চেয়ারম্যান পদে ভোট হবে। মঙ্গলবার বিজ্ঞপ্তি জারি করে পুরো নির্বাচনী সূচিও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৩০ জুন পর্যন্ত মনোনয়ন জমা দেওয়া যাবে। ১ জুলাই হবে স্ক্রুটিনি। ২ জুলাই বিকেল ৩টে পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে। তার পর ৫ জুলাই ভোটগ্রহণ। তাতে অংশ নেবেন শুধুমাত্র বিরোধী বিধায়করা অর্থাৎ কংগ্রেস, সিপিএম, আইএসএফ-সহ বিরোধী শিবিরের মোট ৮৭ জন বিধায়ক। প্রত্যেক কমিটির সদস্য সংখ্যা ২০।
সাধারণত বিধানসভার রীতি বলছে, পিএসি বা পাবলিক আন্ডারটেকিং কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলির নেতৃত্ব বিরোধীদের হাতেই থাকে। বিরোধী দল যাঁর নাম মনোনীত করে, তিনিই চেয়ারম্যান হন। দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রথা চলে এসেছে। কিন্তু এ বার সেই সহজ সমীকরণ আর নেই। কারণ, বিরোধী আসনে বসার পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে এমন ভাঙন শুরু হয়েছে, যা সরাসরি বিধানসভার গঠন ও কার্যপ্রণালীতেই প্রভাব ফেলছে।
২৬-এর বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ভিত নড়ে যায়। ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৫ জনই ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে নাম লেখান। উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সেই গোষ্ঠী নিজেদেরই ‘আসল’ তৃণমূল বলে দাবি করে। শুধু দাবি নয়, বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব দেখিয়ে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতিও তারা ছিনিয়ে নেয়। তবে সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আইনি পথে হাঁটে কালীঘাটের তৃণমূল। ফলে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শেষ পর্যন্ত কাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, তা এখনও আদালতের বিবেচনাধীন।
এই জটিল পরিস্থিতিতেই পিএসি-সহ চারটি কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচন কার্যত রাজনৈতিক শক্তিপরীক্ষার মঞ্চ হয়ে উঠছে। বিধানসভা সূত্রের খবর, পিএসি চেয়ারম্যান পদে আপাতত এগিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির। ফিরহাদ হাকিমকে এই দায়িত্বে বসাতে চাইছে তারা। অন্য দিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির এই নির্বাচনে কাকে প্রার্থী করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিধানসভা মহলের একাংশের মতে, এ বারের নির্বাচন কেবল চারটি কমিটির চেয়ারম্যান বাছার প্রক্রিয়া নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বিরোধী রাজনীতির ভিতরকার প্রকৃত শক্তির মানচিত্র। আদালতের বাইরে, বিধানসভার ভিতরেই তাই একপ্রকার ‘লিটমাস টেস্ট’-এর মুখে তৃণমূলের দুই শিবির। ৫ জুলাইয়ের ভোট সেই কারণেই নিছক সাংগঠনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তা হয়ে উঠতে চলেছে বিরোধী শিবিরের ক্ষমতার আসল মাপজোক।





