কোচবিহার, ২ সেপ্টেম্বরঃ সংরক্ষণের সুযোগ নিয়ে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতির অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এ বার সেই অভিযোগের আঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের গায়ে। ভুয়ো এসসি শংসাপত্র দেখিয়ে কোচবিহারের পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করার অভিযোগ উঠেছে কার্তিক দাসের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট শংসাপত্র বাতিল হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শোকজের জবাবও কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক হয়নি বলে অভিযোগ। আর তার পরেই সমাবর্তনের আগে তাঁকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সঞ্চারী রায় মুখোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি প্রকাশ্যে এসেছে। তাতে সাসপেনশনের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে বলে খবর। যদিও বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অধ্যাপক কার্তিকের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সূত্রপাত আরও আগে। অসমের বাসিন্দা কার্তিক কী ভাবে কোচবিহারের মহকুমা প্রশাসনের দফতর থেকে এসসি শংসাপত্র পেলেন, সেই প্রশ্নই এখন তদন্তের কেন্দ্রে। ওই শংসাপত্রের ভিত্তিতেই তিনি পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পরে শংসাপত্রটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তদন্তের পর প্রায় এক মাস আগে মহকুমাশাসক সেটি বাতিল করেন বলে জানা যাচ্ছে। সেই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হয়। এর পরেই অধ্যাপককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। জবাব খতিয়ে দেখে কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট না হওয়ায় সাসপেনশনের পথে হাঁটে বিশ্ববিদ্যালয়।
ভারতীয় সংবিধানের ৩৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে কোন সম্প্রদায় কোন রাজ্যে তফসিলি জাতি হিসেবে স্বীকৃত হবে, তার সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারিত। সংবিধান সিডুল কাস্ট অর্ডার, ১৯৫০-তেও রাজ্যভিত্তিক স্বীকৃতির বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে এসসি শংসাপত্রের আবেদন ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জন্মস্থান, নাগরিকত্ব, পশ্চিমবঙ্গে বসবাসের প্রমাণ-সহ একাধিক তথ্য নেওয়া হয়। পরিবারের অন্য সদস্যের শংসাপত্র এবং অন্য রাজ্য থেকে পরিবারের স্থানান্তরের তথ্যও আবেদনে জানাতে হয়। ফলে অন্য রাজ্যের বাসিন্দা হয়েও কী পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট শংসাপত্র মিলেছিল, তা প্রশাসনিক তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শুধু পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, অভিযোগ আরও গুরুতর। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার আগে মাথাভাঙা মহাবিদ্যালয় এবং আলিপুরদুয়ারের শামুকতলা মহাবিদ্যালয়েও একই এসসি শংসাপত্র ব্যবহার করে তিনি চাকরি করেছিলেন বলে অভিযোগ। সত্যি হলে প্রশ্ন উঠছে, নিয়োগের সময় সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই হয়েছিল কি না। একটি শংসাপত্র বাতিল হওয়ার পর সেই নথির ভিত্তিতে আগের নিয়োগগুলির বৈধতা নিয়েও স্বাভাবিক ভাবেই প্রশাসনিক প্রশ্ন উঠবে। পশ্চিমবঙ্গের সংরক্ষণ আইনে এসসি বা এসটি হিসেবে চাকরির দাবির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র বা শংসাপত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু এক ব্যক্তির চাকরি বা সাসপেনশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংরক্ষিত পদে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর সুযোগ নষ্ট হয়েছে কি না, নিয়োগের সময় নথি যাচাই কতটা কঠোর ছিল, এবং প্রশাসনিক স্তরে কোথাও গাফিলতি হয়েছিল কি না উঠবে সেই প্রশ্নও। কার্তিক দাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও চূড়ান্ত ভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে শংসাপত্র বাতিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাসপেনশন সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি এখন তদন্তের মুখে।





