মনিরুল হক, কোচবিহারঃ বিধানসভা ভোটের আগে বাংলায় শুরু হওয়া এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে রাজ্যজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে। এই প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বলে জানা গিয়েছে। আর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলায়, বিশেষ করে মাথাভাঙা বিধানসভা কেন্দ্রে।
এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক বলেন, যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাদের জন্য এখনও আইনি পথ খোলা রয়েছে। তাঁর কথায়, “তারা ট্রাইবুনালে আবেদন করতে পারেন। সেখানে যাচাইয়ের পর যাদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হবে, তারাই বৈধ ভোটার হিসেবে বিবেচিত হবেন।” তবে একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের অধিকাংশই অনুপ্রবেশকারী হতে পারেন।
নিশীথ প্রামাণিকের এই মন্তব্যকে ঘিরেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। নাম বাদ যাওয়া রাজবংশী, নমশূদ্র, তফসিলি জাতি(এসসি), মুসলিম সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বিনা প্রমাণে সাধারণ ভোটারদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা হয়েছে, যা অত্যন্ত অপমানজনক।
মাথাভাঙার ঘোকসারডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা এক রাজবংশী যুবক ভাস্কর বর্মণ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, নিশীথ প্রামাণিক নিজেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী। তাঁর দাবি, নিশীথ বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর গ্রামে ভেলাকোপার বাসিন্দা। সেখানে তার বড় জ্যাঠা দক্ষিণা রঞ্জন প্রামাণিক বসবাস করেন। ২০১৮ সালে নিশীথ প্রামাণিক বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি বেশ কিছু দিন কাটিয়ে এসেছিল। ভাস্করের কথায়, “যিনি নিজেই অনুপ্রবেশকারী বলে অভিযুক্ত, তিনি অন্যদের সেই তকমা দিচ্ছেন এটা মানুষ মেনে নেবে না।”
একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নমশূদ্র সম্প্রদায়ের ভেটাগুড়ি এলাকার এক যুবক, যিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁর অভিযোগ, পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম ভোটার তালিকায় থাকলেও তাঁর নাম বাদ গেছে। তিনি বলেন, “আমাদের অনুপ্রবেশকারী বলা হলে, তার থেকে বড় অনুপ্রবেশকারী আর কেউ নেই। মানুষ এবার ভোটের মাধ্যমে জবাব দেবে।”
সুটকাবাড়ি এলাকার এক মুসলিম যুবক মাসুদ রানাও একই সুরে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “বিজেপি বিভাজনের রাজনীতি করে। নিশীথ প্রামাণিক মুসলিম বিদ্বেষী মন্তব্য করছেন। মানুষ এই রাজনীতি মেনে নেবে না।” তাঁর দাবি, সাধারণ ভোটারদের অপমান করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসও আক্রমণ শানিয়েছে বিজেপির বিরুদ্ধে। দলের পক্ষ থেকে নিশীথ প্রামাণিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, নিশীথের জন্ম বাংলাদেশে। তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে অসমের কংগ্রেসে সাংসদ রিপুন বোরা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লেখেন এবং নিশীথ বাংলাদেশি কি না তা জানতে চান। সেই তথ্য সামনে আসার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে।
মাথাভাঙা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সাবলু বর্মণ এই প্রসঙ্গে কড়া ভাষায় বলেন, “যিনি নিজেই অনুপ্রবেশকারী এবং বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। সীমান্ত পেরিয়ে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। তিনি আবার অন্য ভোটারদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এটা সম্পূর্ণ ভণ্ডামি এবং যাদের নাম বাদ গেছে তাদের পরিবারকে অপমান করছেন এবং তাদের নিয়ে খিল্লি ওড়াচ্ছেন।” তিনি আরও জানান, মাথাভাঙার মানুষ গণতান্ত্রিক উপায়ে এর জবাব দেবেন এবং ভোটের মাধ্যমে বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করবেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির মধ্যে মালদহের পর কোচবিহারেই সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। ফলে এই ইস্যু এখন শুধু প্রশাসনিক নয়, সরাসরি রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে, এসআইআর প্রক্রিয়া ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক মাথাভাঙা বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচনী সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিজেপি ও তৃণমূলের পারস্পরিক অভিযোগ, পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের ক্ষোভ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ইস্যু আসন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে এবং ফলাফলের নির্ধারক হয়ে উঠতেও পারে।





