কলকাতা, ১৪ মেঃ এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় চাকরি হারানো শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের জীবনে ফের নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তা। আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে এতদিনে পাওয়া বেতন সুদ-সহ ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে এমন খবর সামনে আসতেই উদ্বেগে ঘুম উড়েছে বহু পরিবারের। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জেলার জেলাশাসকদের কাছে প্রশাসনিক নির্দেশ পৌঁছতে শুরু করেছে বলে সূত্রের খবর। আর সেই খবর ছড়াতেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে চাকরিহারাদের মধ্যে।
রাজ্য স্কুল সার্ভিস কমিশনের অধীনে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শেষে কলকাতা হাই কোর্ট কয়েক হাজার নিয়োগ বাতিল করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে জানানো হয়, যাঁরা প্যানেলের বাইরে থেকে নিয়োগ পেয়েছেন, প্যানেলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চাকরি পেয়েছেন অথবা ফাঁকা ওএমআর জমা দিয়েও নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের প্রাপ্ত বেতন সুদ-সহ ফেরত দিতে হবে। পরে সুপ্রিম কোর্ট অফ ইন্ডিয়া-ও সেই নির্দেশ বহাল রাখে।
তবে এই নির্দেশের বিরুদ্ধে চাকরিহারাদের একাংশ পৃথক মামলা দায়ের করেছেন এবং সেই মামলা এখনও বিচারাধীন। কিন্তু প্রশাসনিক স্তরে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার প্রস্তুতির খবর সামনে আসতেই উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে। চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের দাবি, সুদ-সহ পুরো বেতন ফেরত দিতে হলে মাথাপিছু প্রায় ৪৪ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত গুনতে হতে পারে। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এত বড় অঙ্কের টাকা ফেরত দেওয়া কার্যত অসম্ভব।
সিউড়ির চাকরিহারা শিক্ষিকা শতাব্দী সরকার বলেন, “এখনও পর্যন্ত টাকা ফেরতের কোনও সরকারি নোটিস হাতে পাইনি। তবে আদালতের রায়ে যাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, আমি সেই তালিকায় পড়ি না। আমি পরীক্ষা দিয়ে সম্পূর্ণ উত্তর লিখেছিলাম। তাই আমার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়।” তাঁর আশঙ্কা, সব চাকরিহারার কাছ থেকেই যদি টাকা ফেরত চাওয়া হয়, তাহলে তা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করবে।
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমাদের চাকরি যদি অবৈধ হয়েও থাকে, আমরা তো সাড়ে ছয় বছর ধরে নিয়মিত স্কুলে গিয়ে পড়িয়েছি। ছাত্রছাত্রীদের দায়িত্ব পালন করেছি। আমাদের সেই পরিশ্রমের কি কোনও মূল্য নেই? জেলের কয়েদিরাও শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক পান। তাহলে আমাদের শ্রমকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হবে কেন?”
চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের একাংশের বক্তব্য, একদিকে চাকরি হারিয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে কয়েক বছরের বেতন সুদ-সহ ফেরতের চাপ তাঁদের আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে পারে। বহু পরিবার ইতিমধ্যেই সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন খরচ চালাচ্ছে। কারও সন্তানের পড়াশোনা, কারও পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
জেলার প্রায় আড়াইশো চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর মধ্যে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে “আমাদের শ্রমের কি কোনও মূল্য নেই?” অনেকেই সম্মিলিতভাবে ফের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা ভাবছেন। কেউ পৃথকভাবে আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন। তাঁদের আশা, আদালত প্রকৃত মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া এবং দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্তদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করবে এবং সেই অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত দেবে।
যদিও এখনও সব জেলায় আনুষ্ঠানিক নির্দেশ পৌঁছয়নি, তবু প্রশাসনিক তৎপরতার খবরেই চাকরিহারা পরিবারগুলির মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ক্রমশ বাড়ছে।





