নয়াদিল্লি, ২৯ সেপ্টেম্বরঃ ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ তুললেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব আর কে সিংহ। তাঁর দাবি, ২০০৩ সালের পর নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকদের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া বহু নাম কোনও যথাযথ তদন্ত, নোটিস বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুরো বিষয়টিকে তিনি ‘বেআইনি’ বলে দাবি করে নিরপেক্ষ তদন্তেরও আবেদন জানিয়েছেন।
এসআইআর নিয়ে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করে আর কে সিংহের অভিযোগ, গোটা দেশে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের সিদ্ধান্তই আইনি প্রশ্নের মুখে। তাঁর বক্তব্য, আইনের নির্দিষ্ট ধারায় বিশেষ পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকলেও সেটিকে সাধারণ নিয়মে পরিণত করা যায় না। এমনকি এসআইআর বহাল রাখার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও সরব হয়েছেন প্রাক্তন এই আমলা। তাঁর দাবি, আইনে নির্দিষ্ট কারণ, তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট ভোটারকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার পরেই নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু এসআইআর-এর ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া যথাযথ ভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। বিশেষ করে ২০০৩ সালের তালিকায় পরিবারের সদস্যদের তথ্য চাওয়ার ফলে নতুন প্রজন্মের বহু ভোটার সমস্যায় পড়েছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ফর্ম-৬-এর পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আর কে সিংহ। তাঁর দাবি, অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মতামতের বিরোধিতা সত্ত্বেও ফর্মে পরিবর্তন করা হয়েছিল। যদিও নির্বাচন কমিশন পরে জানিয়েছে, দেশজুড়ে এসআইআর-এর সিদ্ধান্ত তিন নির্বাচন কমিশনারের সর্বসম্মত অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছিল। ফর্ম-৬-এ পরিবর্তনের বিষয়টিও সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন পেয়েছে বলে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে।
এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেও মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত কয়েক মাসে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলাও হয়েছে। সেখানে এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বৈধতা এবং ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
আর কে সিংহের আরও অভিযোগ, এসআইআর-এর প্রক্রিয়ায় দরিদ্র, পরিযায়ী শ্রমিক এবং নথিপত্রে দুর্বল অংশের মানুষ বেশি সমস্যায় পড়েছেন। বহু মানুষ কাজের জায়গা থেকে বাড়ি ফিরে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে পারেননি বলেও দাবি তাঁর। ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’র মতো কারণ দেখিয়ে যথাযথ তদন্ত ছাড়া নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
এসআইআর-এর মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে এই দাবি তুলে ভোটের ফলাফলে তার প্রভাব পড়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন প্রাক্তন এই বিজেপি নেতা। তবে এই সংখ্যাকে ঘিরে বিতর্ক রয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এসআইআর-এর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া বা সংশোধনের বিষয়গুলি নিয়ে দাবি-আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। কমিশন সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে শুনানি ও নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া আরও সহজ করার কথাও জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলিকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আর কে সিংহ। তাঁর দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এবং EVM-এর বদলে নতুন করে ব্যালটে ভোটের দাবিতে বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। এমনকি দাবি পূরণ না হলে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি বিতর্ক অবশ্য এখনও অব্যাহত। জ্ঞানেশ কুমারের কার্যপ্রণালী এবং এসআইআর-এর বৈধতা নিয়ে দায়ের হওয়া একটি মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টও বিষয়টি খতিয়ে দেখার সম্মতি দিয়েছে।





