কোচবিহার, ৫ নভেম্বরঃ ইতিহাসের শহর কোচবিহার। রাজবাড়ির অলিন্দ থেকে মদনমোহন মন্দিরের প্রাঙ্গণ এ শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে রয়েছে রাজপরম্পরা ও প্রাচীন সংস্কৃতির নানা স্মৃতি। সেই ঐতিহ্যেরই এক উজ্জ্বল অধ্যায় মদনমোহন মন্দির চত্বরের কাঠামিয়া মন্দিরে ‘বড় তারা’র কালীপুজো। রাজআমলে শুরু হওয়া শতাব্দীপ্রাচীন এই আরাধনায় সময়ের ছাপ পড়লেও বদলায়নি নিষ্ঠা, ভক্তি আর প্রাচীন রীতিনীতির আবহ।
এক সময়ে কোচবিহারের মহারাজা ও রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজপ্রাসাদেই অনুষ্ঠিত হত এই পুজো। ১৮৯০ সালে মদনমোহন মন্দির প্রতিষ্ঠার পর রাজপ্রাসাদ থেকে পুজো স্থানান্তরিত হয় মন্দির চত্বরে অবস্থিত কাঠামিয়া মন্দিরে। বর্তমানে দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সেই পরম্পরা বজায় রয়েছে।
‘বড় তারা’র পুজোর অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন বলির রীতি। প্রচলিত নিয়মে ছাগল, পায়রা, হাঁস, ভেড়া এবং মাগুর মাছ এই পাঁচ ধরনের বলির প্রথা রয়েছে। এক সময়ে মাগুর মাছের পরিবর্তে কচ্ছপ বলি দেওয়ার রীতি ছিল বলেও জানা যায়। দেবীর ভোগেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। ভাজা শোল মাছ নিবেদন করা হয় দেবীকে। এই বিশেষ আচারই অন্য কালীপুজোর থেকে বড় তারার আরাধনাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
প্রতিমাতেও রয়েছে রাজপরম্পরার নিজস্ব ছাপ। প্রায় সাড়ে দশ হাত উচ্চতার কালো বর্ণের দেবীমূর্তির এক হাতে থাকে খড়্গ, অন্য হাতে মুণ্ডের পরিবর্তে রক্তপূর্ণ পাত্র। রাজআমল থেকেই কোচবিহারের একটি চিত্রকর পরিবার বংশপরম্পরায় এই প্রতিমা তৈরি করে আসছে। বর্তমানে প্রায় তিন দশক ধরে সেই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন শিল্পী প্রভাত চিত্রকর।
লক্ষ্মীপুজোর চার দিন পর থেকেই প্রায় ১৫ ফুট উচ্চতার কাঠামিয়া মন্দিরে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এ বারও মন্দিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আগামী ৮ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টা থেকে শুরু হবে দেবীর আরাধনা। পুষ্পাঞ্জলি, বলি ও ভোগ নিবেদনের পাশাপাশি সন্ধ্যা থেকেই মন্দির চত্বরে জ্বলবে প্রদীপ।
রাজকীয় ইতিহাস, স্বতন্ত্র প্রতিমাশিল্প এবং প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের মেলবন্ধনে ‘বড় তারা’র পুজো আজও কোচবিহারের নিজস্ব পরিচয়ের অংশ। প্রজন্ম বদলেছে, সময় এগিয়েছে, কিন্তু রাজআমল থেকে বয়ে আসা এই ঐতিহ্যের টান আজও অটুট।





