কোচবিহার, ৩০ অক্টোবরঃ দীপাবলি মানেই আলোর উৎসব। অন্ধকার সরিয়ে ঘরে ঘরে আলো জ্বালানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। কালীপুজোর আগে বাজারে সাজতে শুরু করেছে নানা রঙের টুনি লাইট, এলইডি এবং বাহারি বৈদ্যুতিক আলোর সম্ভার। কিন্তু সেই আলোর ঝলকানির মধ্যেই ক্রমশ ম্লান হচ্ছে মাটির প্রদীপের কদর। এক সময় দীপাবলির বাজারে যে প্রদীপের চাহিদা ছিল তুঙ্গে, এখন তার বরাতই অর্ধেকের কাছাকাছি। তার উপর আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা। সব মিলিয়ে উৎসবের মুখে জোড়া দুশ্চিন্তায় কোচবিহারের মৃৎশিল্পীরা।
হাতে সময় বেশি নেই। তাই কালীপুজোর আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা। কোথাও মাটি মাখা হচ্ছে, কোথাও ছাঁচে তৈরি হচ্ছে প্রদীপ, আবার কোথাও সারি সারি কাঁচা প্রদীপ শুকানোর অপেক্ষায়। কিন্তু কাজের ব্যস্ততা থাকলেও মুখে হাসি নেই শিল্পীদের। তাঁদের আক্ষেপ, বদলে গিয়েছে উৎসবের আলোকসজ্জার ধরন। এক সময় বাড়ির উঠোন থেকে মন্দির, দোকান থেকে রাস্তার ধারে সর্বত্রই দেখা যেত মাটির প্রদীপের সারি। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে বিদ্যুতের টুনি লাইট ও নানা ধরনের আলোকসজ্জা।
এক মৃৎশিল্পীর কথায়, আগে দীপাবলির মরসুমে ৪০ থেকে ৫০ হাজার প্রদীপের বরাত মিলত। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ থেকে ২৫ হাজারে। তিনি বলেন, ‘‘আগের মতো আর মাটির প্রদীপের চাহিদা নেই। তবুও বাপ-ঠাকুরদার পেশা আঁকড়ে ধরে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু বর্তমান বাজারে খরচ বাদ দিয়ে লাভের মুখ দেখা কঠিন।’’
চাহিদা কমার পাশাপাশি বেড়েছে উৎপাদনের খরচ। মাটি ও জ্বালানির দাম বাড়লেও প্রদীপের বিক্রির দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। তার উপর এ বছর আবহাওয়াও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক দিনের অনিয়মিত আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত রোদ না মেলায় কাঁচা প্রদীপ শুকোতে সমস্যা হচ্ছে। সময়মতো প্রদীপ তৈরি করে পোড়ানো এবং বাজারে পৌঁছে দেওয়া নিয়েও চিন্তায় রয়েছেন শিল্পীরা। আবহাওয়া আরও প্রতিকূল হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বরাত সামলানো কঠিন হতে পারে।
আরও একটি আশঙ্কা তাঁদের ভাবাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর এই পেশায় আসতে চাইছেন না। ফলে বাজারের প্রতিযোগিতা এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার চাপে ক্রমশ অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।
আলোর উৎসবে চারপাশ ঝলমল করলেও সেই আলো তৈরির কারিগরদের ঘরে দুশ্চিন্তার ছায়া। মাটির প্রদীপের ব্যবহার বাড়ানো এবং শিল্পীদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা না গেলে কয়েক প্রজন্মের হাতে গড়ে ওঠা এই শিল্পের আলোও এক দিন নিভে যেতে পারে।





