কলকাতা, ১৪ মেঃ ভোট-পরবর্তী হিংসা মামলাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার কলকাতা হাই কোর্ট-এ দেখা গেল বিরল রাজনৈতিক ছবি। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে একযোগে সওয়াল করতে দেখা গেল তৃণমূল এবং বাম শিবিরকে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পাশে দাঁড়িয়ে আদালতে সওয়াল করলেন বাম নেতা তথা বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল-এর বেঞ্চে এদিন ভোট-পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত একাধিক মামলার শুনানি হয়। আর সেই শুনানিকেই ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক জল্পনা।
বৃহস্পতিবার সকালেই কালো শামলা পরে আদালতে পৌঁছে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান বিচারপতির এজলাসে দাঁড়িয়ে তিনি বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। উত্তরপ্রদেশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “এটা উত্তরপ্রদেশ নয়, বাংলা। বাংলার মানুষকে বাঁচান।” আদালতে সওয়াল শুরু করার আগে প্রধান বিচারপতির অনুমতি চেয়ে তিনি বলেন, “আমি ১৯৮৫ সাল থেকে আইনজীবী। সেই হিসাবেই আমি সওয়াল করতে চাই।”
এরপর একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর দাবি, ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার চলছে। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “৯২ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ১৮ বছরের দম্পতিকেও বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। তফশিলি জাতি ও সংখ্যালঘুদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।” এমনকি তাঁকেও বাড়ি থেকে বেরিয়ে থানায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, অনলাইনে অভিযোগ জানাতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। এরপরই প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে কাতর আবেদন জানান মমতা “দয়া করে বাংলার মানুষকে নিরাপত্তা দিন।”
এই মামলায় কার্যত মমতার পাশে দাঁড়িয়েই সওয়াল করেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। নিউ মার্কেট এলাকায় হকারদের অস্থায়ী দোকান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার অভিযোগ তুলে তিনি আদালতে দাবি করেন, ক্ষতিগ্রস্তদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
অন্যদিকে রাজ্য পুলিশের তরফে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী ধীরাজ ত্রিবেদী। তিনি দাবি করেন, ভোট-পরবর্তী সমস্ত ঘটনাই রাজনৈতিক সন্ত্রাস নয়। কোথাও কোনও অপরাধ হলে পুলিশ কড়া হাতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি আরও জানান, নিউ মার্কেটের ঘটনায় সরকার কোনও কাঠামো ভাঙেনি এবং ইতিমধ্যেই ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি এই মামলাগুলিকে পুরনো ভোট-পরবর্তী হিংসা মামলার সঙ্গে যুক্ত করে বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর আবেদনও জানান তিনি।
এদিকে আদালতের ভিতরে যখন সওয়াল-জবাব চলছে, তখন বাইরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। আদালত চত্বরে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান ওঠে, যা ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়ায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎপর হয় নিরাপত্তারক্ষীরা।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কয়েকদিন আগেই বিজেপিকে রুখতে বিরোধী ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আবহেই এদিন আদালতে মমতা এবং বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে একই সুরে সওয়াল করতে দেখা যাওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজপথে না হলেও আদালতের এজলাসে এদিন কার্যত বাম-তৃণমূল সমঝোতার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠল।





