কলকাতা, ১০ ডিসেম্বরঃ রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। বিরোধীদের অভিযোগ এসআইআর-এর নামে বাংলায় অযথা আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক প্রতিবাদের মাঝেই এবার গানের ভাষায় সরব হলেন তৃণমূলের আইটি সেলের প্রধান দেবাংশু ভট্টাচার্য। তাঁর নতুন মিউজিক ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজ্যজুড়ে। রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
দেবাংশু বুধবার তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে গানটি প্রকাশ করেন। মুহূর্তের মধ্যেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়। ফেসবুক-ইউটিউব-এক্স জুড়ে ‘শেয়ার’ আর ‘রিশেয়ার’-এর ঝড় উঠেছে। গানটির প্রতিটি পঙ্ক্তিতে বিরোধী বিজেপিকে নিশানা করেছেন দেবাংশু। পাশাপাশি দাবি করেছেন, যতই এসআইআর বা রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা হোক, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার মানুষ ফের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ক্ষমতায় বসাবেন।
গানে কী রয়েছে?
গানের শুরুতেই শোনা যায়, “হ্যালো মোদিজি… মুসলমানরা ভয় পাচ্ছে, হিন্দু হচ্ছে বোকা, বানিয়ে বোকা ভাবছো তুমি জিতবে ভোটে বোকা?” এভাবেই একে একে নোটবন্দি, আধার লিংক, মূল্যবৃদ্ধি, এনআরসি, অনুপ্রবেশ ইস্যু প্রতিটি জাতীয় প্রশ্নকে গানের ছন্দে তুলোধোনা করেছেন তৃণমূলের এই তরুণ মুখ। আরও একটি পঙ্ক্তিতে শোনা যায়, “যতই করো এসআইআর, এ বাংলা ফের মমতার” যা ইতিমধ্যেই তৃণমূল সমর্থকদের নতুন রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে উঠেছে।
গানটির ছন্দে উঠে এসেছে কৃষকের দুর্দশা, বিজেপির নির্বাচনী কৌশল, গ্যাস-ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, কেন্দ্রের দপ্তরগুলির ভূমিকা নিয়ে একাধিক কটাক্ষ। কোথাও বিরোধী নেতৃত্বের দিকে তীর ছোড়েছেন, কোথাও আবার কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বিজেপিকে একের পর এক কটাক্ষ
গানের মধ্যেই বারবার উঠে এসেছে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার, দিলীপ ঘোষ, লকেট চট্টোপাধ্যায়, মিঠুন চক্রবর্তী সহ একাধিক নেতার নাম এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ইঙ্গিত।
উদাহরণস্বরূপ, “যুদ্ধে তোদের মুখকে হবে কাঠি ভাঙা রকেট,
শুভেন্দু না সুকান্তদা, মিঠুন নাকি লকেট?”
আবার কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গে শুনতে পাওয়া যায়
“নিয়ে আয় তোদের মোদি-শাহকে, ইডি-সিবিআই,
একলা প্লেয়ার খেলবে আবার জিতবে দিদিভাই।”
পাশাপাশি জনগণের আর্থিক সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধি, চাকরির অনিশ্চয়তা, ১০০ দিনের কাজের বকেয়া এসব বিষয়ও গানের কেন্দ্রে রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ঝড়
ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই তৃণমূল শিবিরে উচ্ছ্বাস। অনেকেই মনে করছেন, ঠিক যেমন ২০২১ সালের ভোটের আগে “খেলা হবে” স্লোগান বাংলার রাজনৈতিক হাওয়ার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, তেমনই ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে এই গানটিও সমান প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, বিজেপির তরফে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তৃণমূল ইচ্ছাকৃতভাবে বিভাজনের রাজনীতি করছে, মানুষের বাস্তব সমস্যার পরিবর্তে আবেগকে উসকে দেওয়া হচ্ছে।
এক বিজেপি নেতার কথায়, “এসআইআর হচ্ছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। এটাকে ভুলভাবে প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এমন গান দিয়ে মানুষকে প্রকৃত সমস্যা থেকে সরানো হচ্ছে।”
তৃণমূল অবশ্য দাবি করছে, এসআইআর-এর নাম করে বাংলার সংখ্যালঘু ও তফসিলি সম্প্রদায়ের ভোটারদের মধ্যে ভয় তৈরি করছে বিজেপি।
তৃণমূলের অবস্থান পরিষ্কার, “বাংলার মানুষ বাংলা চালায়। দিল্লি থেকে নির্দেশে ভোটার তালিকা বদলানোর চেষ্টা হলে প্রতিবাদ হতেই থাকবে।”
দেবাংশুর গান নিয়ে আগ্রহ কেন?
একুশের নির্বাচনের আগে তাঁর তৈরি “খেলা হবে” স্লোগান প্রায় যুদ্ধ-ধ্বনির মতো সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে খেলাঘর পর্যন্ত, সব জায়গায় প্রতিধ্বনিত হয়েছিল সেই স্লোগান। এমনকি বাংলাদেশের নির্বাচনেও “খেলা হবে” ব্যবহার হয়।
ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেবাংশুর নতুন গানটি যে ২০২৬-এর নির্বাচনী আবহে তৃণমূলের অন্যতম প্রচার অস্ত্র হতে চলেছে, তা স্পষ্ট।
এসআইআর বিতর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?
এসআইআর-এর প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা, ব্লোদের ভাতা ইস্যু, ফর্ম অসংগৃহীত থাকা সব মিলিয়ে রাজ্যে ইতিমধ্যেই উত্তেজনা তুঙ্গে। মমতা ও অভিষেক খোলাখুলি বলছেন, “এসআইআর-এর নামে বাংলায় নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।” এই উত্তপ্ত পরিবেশে দেবাংশুর গানের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ল বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
এখন প্রশ্ন-এ গানের প্রভাব কতটা?
রাজনৈতিক দফায় দফায় লড়াই, এসআইআর বিতর্ক, কেন্দ্র-রাজ্যের সংঘাত, ২০২৬-এর নির্বাচনী প্রস্তুতি সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন তপ্ত। এই আবহে দেবাংশুর গান একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে নিঃসন্দেহে। তবে “খেলা হবে”-র মতো এই গানও মানুষের মুখে-মুখে ফিরে কি না, এবং ২০২৬-এর নির্বাচনে আদৌ কোনও প্রভাব ফেলে কি না তা সময়ই বলে দেবে।





