বালুরঘাট, ২ সেপ্টেম্বরঃ লক্ষ লক্ষ টাকার নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ। গন্তব্য ছিল সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ। তার আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ল সেই বিপুল নেশার কারবার। সোমবার বালুরঘাট পুলিশ সুপারের দফতরের সামনে সেই বাজেয়াপ্ত ফেনসিডিলের স্তূপের উপর দিয়ে নিজেই রোড রোলার চালালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশে ছিলেন বালুরঘাটের সাংসদ সুকান্ত মজুমদার। আর সেই দৃশ্যকে সামনে রেখেই মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা শুধু মাদক উদ্ধার নয়, এ বার লক্ষ্য ‘নেশামুক্ত বাংলা’। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর এ দিনই প্রথম বালুরঘাট সফরে যান শুভেন্দু। তাঁর সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল উদ্ধার হওয়া প্রায় দু’লক্ষ নিষিদ্ধ নেশার সিরাপ ধ্বংস।
প্রশাসনের দাবি, সীমান্তপথে পাচারের আগেই ওই বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। প্রকাশ্য মঞ্চ থেকেই পুলিশ-প্রশাসনের আধিকারিকদের এই সাফল্যের জন্য ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী।শুভেন্দুর কথায়, পশ্চিমবঙ্গকেও নেশামুক্ত করার লক্ষ্যে অভিযান আরও জোরদার হবে। কোথাও নিষিদ্ধ মাদক উদ্ধার হলে তা আইন মেনে ধ্বংস করার পাশাপাশি কারবারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তাঁর হুঁশিয়ারি, মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্তদের দীর্ঘ সময় জেলের পিছনে কাটাতে হতে পারে।দক্ষিণ দিনাজপুরের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত এই জেলার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে সেই সীমান্ত-সমীকরণও। তাঁর দাবি, গত কয়েক মাসে পুলিশ ও বিএসএফের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। তার ফলেই বিপুল পরিমাণ নেশাদ্রব্য উদ্ধার সম্ভব হয়েছে।
প্রশাসনিক মহলের বক্তব্য, সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার ঠেকাতে শুধু একটি সংস্থার অভিযান যথেষ্ট নয়। গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্ত নজরদারি, স্থানীয় পুলিশের তদন্ত এবং বিএসএফের সমন্বিত পদক্ষেপ সবকিছুকেই একসঙ্গে কাজ করতে হয়। বিশেষ করে ফেনসিডিলের মতো নিষিদ্ধ নেশাদ্রব্যের পাচারে আন্তঃরাজ্য ও আন্তঃসীমান্ত চক্র জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।মাদক সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে মূল আইনি কাঠামো হল Narcotic Drugs and Psychotropic Substances Act, 1985 (NDPS Act)।
নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্যের বেআইনি পাচার, সংরক্ষণ বা ব্যবসার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ধারায় গ্রেফতার ও বিচার হতে পারে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রী আদালত ও তদন্তের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া মেনে নিষ্পত্তি করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।তবে মাদক ধ্বংসের এই প্রতীকী দৃশ্যের পাশাপাশি বড় প্রশ্ন অন্য জায়গায় এই বিপুল নিষিদ্ধ সিরাপ কোথা থেকে এল, কারা এর পিছনে ছিল এবং কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে সেই চক্র? উদ্ধারই শেষ নয়, সেই ‘উৎস’ পর্যন্ত পৌঁছনোটাই পুলিশের কাছে বড় পরীক্ষা।
সোমবার বালুরঘাট সফরে মাদকবিরোধী কর্মসূচির পাশাপাশি প্রশাসনিক বৈঠকও করেন মুখ্যমন্ত্রী। দক্ষিণ দিনাজপুর এবং বালুরঘাট লোকসভা এলাকার অনুমোদিত ও প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনার কথা ছিল। ফলে সফরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচির মাঝেই নেশাবিরোধী বার্তাকে সামনে এনে সরকার যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিতে চাইছে, তা স্পষ্ট। রোড রোলারের নীচে গুঁড়িয়ে গেল দু’লক্ষ বোতল। কিন্তু প্রশাসনের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ বোতল ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে মাদকের যে চক্র, সেটাকেও কি ভাঙা যাবে?





