নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: পার্ক সার্কাসের সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে গোপাল মুখার্জি রোড করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখনই কলকাতার আরও রাস্তা ও এলাকার নাম বদলের ইঙ্গিত দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুধু ইঙ্গিতই নয়, নামকরণ পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটি কমিটিও গড়ে দিলেন তিনি। সেই কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কার্তিক মহারাজকে। মঙ্গলবার বিধানসভায় সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “সুরাবর্দির নাম থাকবে না। এই কলকাতায় কোনও মোঘল-পাঠানের নাম থাকবে না।”
বিধানসভায় এ দিন বিষয়টি তোলেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, ইতিহাস বিকৃত করে সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলানো হচ্ছে। বিরোধী শিবিরের দাবি, ওই রাস্তার নাম হোসেন শহিদ সুরাবর্দির নামে নয়, তাঁর দাদু মৌলানা ওবায়েদুল্লাহ সুরাবর্দির নামে। সেই প্রসঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রীর জবাব, নামকরণের প্রশ্নে আর কোনও বিভ্রান্তি রাখা হবে না। নতুন করে মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। এ জন্য কার্তিক মহারাজের নেতৃত্বে একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, কারও কাছে কোনও প্রস্তাব থাকলে তা ওই কমিটির কাছে জানানো যেতে পারে।
শুভেন্দুর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর নামকরণ-নীতি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কলকাতায় কোনও মোঘল, পাঠান বা অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকের নামে রাস্তা বা এলাকার নাম থাকবে না। ভগিনী নিবেদিতা ছাড়া কোনও বিদেশির নামও রাখা হবে না। তবে এপিজে আব্দুল কালামের মতো “প্রকৃত দেশভক্ত”-দের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর কথায়, “আপনি আমাদের বাঙালির সংস্কৃতি, গৌরব মুছিয়ে ফেলতে পারেন না।”
পার্ক সার্কাসের সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক মহলে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারের দাবি, ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর জন্য দায়ী হোসেন শহিদ সুরাবর্দির নামেই ওই রাস্তার নাম ছিল। তাই সেই নাম সরিয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক সংশোধন। যদিও বিরোধী শিবির এবং ইতিহাসবিদদের একাংশ এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, সরকার রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ইতিহাসকে সরলীকরণ করছে।
মঙ্গলবার বিধানসভায় সেই বিতর্কই নতুন মাত্রা পায়। বিরোধী দলনেতা যখন সুরাবর্দি নামের ঐতিহাসিক উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, মুখ্যমন্ত্রী তখন পালটা স্বাধীনতা সংগ্রামী বীণা দাসের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলা ও বাঙালির আত্মপরিচয়কে সামনে রেখেই নতুন করে রাস্তা ও এলাকার নামকরণ নিয়ে ভাবতে চায় সরকার।
রাজনৈতিক মহলের মতে, সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদল নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর মধ্যে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা। এক দিকে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে সংঘাত, অন্য দিকে শহরের স্মৃতি ও পরিচয়ের নতুন মানচিত্র আঁকার চেষ্টা দুইয়ের সংযোগস্থলেই দাঁড়িয়ে এই নামবদলের রাজনীতি। কার্তিক মহারাজের কমিটি সেই প্রক্রিয়াকে কত দূর নিয়ে যায়, এখন নজর সেদিকেই।





