খবরিয়া ২৪ ডেস্ক, ১০ এপ্রিল: দেশের রাজনৈতিক পরিসরে বহুদিন ধরেই উচ্চারিত একটি বহুল আলোচিত স্লোগান “হিন্দু খতরে মে হে”। বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচার, জনসভা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে এই স্লোগানকে সামনে রেখে মতাদর্শগত লড়াই ক্রমশ তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই ইস্যু নতুন করে প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে উঠে আসা তথ্য ও পরিসংখ্যান এই স্লোগানকে কেন্দ্র করে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে এই স্লোগানের মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে। সমর্থকদের মতে, ধর্মীয় পরিচয়, ঐতিহ্য ও সামাজিক অবস্থান রক্ষার জন্য সচেতনতা তৈরি করাই এই স্লোগানের মূল উদ্দেশ্য। বিজেপির একাধিক নেতা জনসভায় এই বক্তব্য তুলে ধরে দাবি করেছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং সেই কারণেই এই বিষয়টি জনসমক্ষে আনা জরুরি।
পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব একই সুরে কথা বলেছে। তাদের দাবি, রাজ্যের একাধিক ঘটনায় হিন্দুদের উপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং সেই প্রেক্ষিতেই “হিন্দু খতরে মে হে” স্লোগান ব্যবহার করে ভোটারদের সতর্ক করা হচ্ছে। তবে এই দাবির পাল্টা জোরালো আক্রমণ শানিয়েছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি একাধিক সভায় অভিযোগ করেছেন, বিজেপি পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে।
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই সামনে আসে এসআইআর প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে, বাংলায় ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ায় বিজেপি ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে চেয়েছিল। যদিও এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে বিজেপি।
এসআইআর প্রক্রিয়ার শেষে যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা ঘিরেই মূল বিতর্ক। জানা গিয়েছে, তিনটি ধাপে মিলিয়ে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তবে এই বাদ পড়া নামের মধ্যে কতজন হিন্দু এবং কতজন মুসলিম এই তথ্য নির্বাচন কমিশনের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেস সংগঠনগত স্তরে হিসাব কষে দাবি করেছে, মোট বাদ পড়া নামের প্রায় ৬৩ শতাংশই হিন্দু।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসআইআরের প্রথম ধাপে প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৬৯ জনের নাম বাদ পড়ে। এর মধ্যে ৪৩ লক্ষ ৮১ হাজার ৩৭৮ জন ছিলেন হিন্দু এবং প্রায় ১৩ লক্ষ ৩৩ হাজার ৩২৫ জন মুসলিম। অর্থাৎ এই পর্যায়ে বাদ পড়া নামের প্রায় ৭৫ শতাংশই হিন্দু।
দ্বিতীয় ধাপে প্রায় ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম বাদ পড়ে, যার মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ ২৮ হাজার ৮২০ জন হিন্দু শতাংশের হিসেবে যা প্রায় ৯৭ শতাংশ। মুসলিম নাম বাদ পড়ে প্রায় ১৩ হাজারের কিছু বেশি।
তৃতীয় তথা সর্বশেষ ধাপে বিবেচনাধীন তালিকা থেকে বাদ পড়ে প্রায় ২৬ লক্ষ ৯৫ হাজার ২৬৬ জনের নাম। এই পর্যায়ে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখানে মুসলিম নাম বাদ পড়েছে প্রায় ১৭ লক্ষ ৬৫ হাজার ৪৭৫, এবং হিন্দু নাম প্রায় ৮ লক্ষ ৩৭ হাজার ১১৬। শতাংশের হিসেবে এই ধাপে মুসলিম নাম বাদ পড়ার হার বেশি হলেও, সামগ্রিক তিনটি ধাপের হিসাব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে হিন্দু নাম বাদ পড়ার হার প্রায় ৬৩ শতাংশ এবং মুসলিম প্রায় ৩৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসার পরই রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, যদি “হিন্দু খতরে মে হে” সত্যিই বাস্তব হতো, তাহলে এসআইআর প্রক্রিয়ায় এত সংখ্যক হিন্দু ভোটারের নাম বাদ পড়ত না। তাদের মতে, এই ঘটনাই প্রমাণ করে বিজেপির রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপির দাবি, এই পরিসংখ্যান একতরফাভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তাদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধন একটি জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যেখানে বিভিন্ন কারণেই নাম বাদ পড়তে পারে যেমন স্থানান্তর, মৃত্যু বা তথ্যের অসঙ্গতি। ফলে শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে এই তথ্য বিশ্লেষণ করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, “হিন্দু খতরে মে হে” স্লোগানটি মূলত একটি রাজনৈতিক বয়ান, যা নির্বাচনের সময় বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই ধরনের স্লোগান সাধারণত ভোটারদের আবেগে প্রভাব ফেলতে এবং নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ককে একত্রিত করতে ব্যবহৃত হয়। তবে এসআইআর-এর মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় উঠে আসা পরিসংখ্যান সেই বয়ানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
অন্যদিকে আরও একাংশ বিশ্লেষক সতর্ক করে দিচ্ছেন, এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ সমাজে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় মিছিল বা উৎসবকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার ঘটনা সামনে এসেছে। ফলে এই ধরনের স্লোগান ও পাল্টা স্লোগান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। “হিন্দু খতরে মে হে” এই স্লোগান আদৌ বাস্তবতার প্রতিফলন, নাকি শুধুই রাজনৈতিক কৌশল তার উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই ইস্যু আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। নির্বাচন যত এগোবে, ততই এই বিতর্ক আরও তীব্র হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।





