খবরিয়া ২৪ ডেস্ক, ১৪ মার্চঃ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’ ঘিরে প্রত্যাশা অনুযায়ী জনসমর্থন না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে দলের অন্দরেই। দলের একাধিক ভিনরাজ্যের নেতার জমা দেওয়া গোপন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সংগঠনগত দুর্বলতা, ভুল রাজনৈতিক কৌশল এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে বাংলায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। এই রিপোর্ট সম্প্রতি নয়াদিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গে বিজেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা পড়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনের কাছে দেওয়া ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, পাহাড় থেকে সাগর পর্যন্ত ‘পরিবর্তন যাত্রা’ ঘিরে প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রত্যাশিত আগ্রহ দেখা যায়নি। বিলাসবহুল রথ, বড় বড় হোর্ডিং এবং প্রচারের জন্য বিপুল অর্থ খরচ করা হলেও বহু জায়গায় সভা-মিছিলে লোকসমাগম ছিল অত্যন্ত কম।
রিপোর্টে আরও দাবি করা হয়েছে, জেলা ও ব্লক স্তরে সংগঠনের অবস্থা দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও এত বড় কর্মসূচি নেওয়া দলীয়ভাবে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে যেখানে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেখানে উপস্থিতি ছিল কয়েকশোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এমনকি বেশ কিছু সভায় খালি চেয়ারই বেশি চোখে পড়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
দলের ভিনরাজ্যের নেতারা রিপোর্টে সাতটি প্রধান কারণ তুলে ধরেছেন, যেগুলির জন্য বাংলায় বিজেপির জনসমর্থন বাড়তে বাধার মুখে পড়ছে বলে তাঁদের মত। ১) বাংলায় ১০০ দিন ও আবাস যোজনার মতো প্রকল্পে গত চার বছর টাকা বন্ধ করা চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। সাধারণ মানুষ বিজেপির এই প্রতিহিংসার রাজনীতি একদম মেনে নেয়নি।
২) বাংলা বললেই বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে পুশব্যাক করা ও ভিনরাজ্যে পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের খুনের মতো ঘটনা ভয়ংকর প্রভাব ফেলেছে বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে। সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিমচন্দ্রের মতো প্রাতঃস্মরণীয় বাঙালিদের নানা সময়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের বিকৃতভাবে ‘অপমান’ করার ইস্যু পদ্ম শিবিরকে গভীর খাদে ফেলে দিয়েছে।
৩) বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণ করার চেষ্টা যে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দর বাংলার মানুষ মেনে নেয়নি এবং একাধিক জেলায় হিংসার রাজনীতির চেষ্টা বিজেপি শিবিরে বুমেরাং হয়েছে বলে টের পেয়েছেন পরিবর্তন যাত্রায় আসা ভিনরাজ্যের পোড়খাওয়া গেরুয়া নেতারা।
৪) প্রথম থেকেই বাংলা ভাষাভাষী রাজ্যের উপর হিন্দি বলয়ের ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পরে মা দুর্গা-মা কালী স্লোগান আঁকড়ে ধরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও তা আদতে বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে।
৫) দু’বছরের পরিবর্তে মাত্র দু’মাসে এসআইআর করতে গিয়ে বড় সংখ্যায় হিন্দু ভোটাররাই (বিশেষত মতুয়া ও রাজবংশী এবং আদিবাসী) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যা বিজেপি শিবিরে মারাত্মক ধাক্কা দেবে বলে পরিবর্তন যাত্রায় অংশ নেওয়া নেতারা উপলব্ধি করেছেন।
৬) বঙ্গ বিজেপির নেতাদের চরম গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং বুথ পর্যায়ে সংগঠন নিয়ে প্রচুর জল মেশানো তথ্য পাঠানো।
৭) জনসমর্থন দূরের কথা, জেলা সদরেও ভরসন্ধেবেলায় সভা করতে গিয়ে পরিবর্তন যাত্রায় আসা নেতারা দেখেছেন, হাতে গোনা কিছু পেটোয়া লোকজন ছাড়া কেউ ছিল না।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে জেলা স্তরের নেতারা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন এবং সেই প্রভাব সংগঠনের নিচুতলা পর্যন্ত পড়েছে।
এদিকে ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রীর সভাকে ঘিরে দলীয় কর্মী-সমর্থক জড়ো করার জন্য ঝাড়খণ্ড, বিহার ও ওড়িশা থেকে ট্রেন ও বাসে করে লোক আনার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে দলীয় মহলে। দলীয় সূত্রের দাবি, সভা সফল করতে ভিনরাজ্য থেকে কর্মী-সমর্থক আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তবে এই রিপোর্ট সামনে এলেও সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন আপাতত কোনও কঠোর পদক্ষেপ নিতে রাজি নন বলেই সূত্রের খবর। দলের একটি অংশের মতে, এখনই কোনও সাংগঠনিক পরিবর্তন করলে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তার দায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপরই পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, পরিবর্তন যাত্রা নিয়ে দলের অন্দরেই যে অসন্তোষ এবং উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেই চিত্রই এই রিপোর্টে স্পষ্ট হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে এই পরিস্থিতি বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।





