খবরিয়া ২৪ ডেস্ক, ১৮ ফেব্রুয়ারিঃ পশ্চিমবঙ্গে কথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুতে নতুন করে চড়ল রাজনৈতিক পারদ। রাজ্যে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা বসবাস করছে-বিজেপি নেতৃত্বের এমন দাবিকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানাল তৃণমূল কংগ্রেস। মঙ্গলবার সমাজমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় শাসকদল জানায়, বিজেপি যে পরিসংখ্যান তুলে ধরছে, তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দেওয়া তথ্যের কোনও সামঞ্জস্য নেই।
বিজেপির একাংশের দাবি, বাংলায় বিপুল সংখ্যক ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ রয়েছে এবং তাঁদের চিহ্নিত করে দেশছাড়া করা হবে। এই প্রসঙ্গে তৃণমূলের কটাক্ষ, “যদি বিজেপির কাছে ১ কোটি মানুষের সুনির্দিষ্ট তালিকা থাকে, তবে তা কোথায়? কেন সেই তালিকা প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না?” শাসকদলের আরও প্রশ্ন, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও এত বড় সংখ্যার প্রমাণ এখনও জনসমক্ষে কেন হাজির করা হয়নি?
এই বিতর্কে তৃণমূল কংগ্রেস কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বার্ষিক রিপোর্ট এবং সংসদে দেওয়া তথ্যের উল্লেখ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর দফতরের তথ্য উদ্ধৃত করে ঘাসফুল শিবিরের দাবি, নরেন্দ্র মোদী সরকারের গত ১০ বছরের শাসনকালে মোট ৩,৪৯৯ জন বাংলাদেশি নাগরিককে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। তৃণমূলের যুক্তি, যদি সত্যিই অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ১ কোটির কাছাকাছি হয়, তবে এক দশকে মাত্র কয়েক হাজার বিতাড়ন সেই দাবির সঙ্গে খাপ খায় না।
তৃণমূলের বক্তব্য, সীমান্ত সুরক্ষা, নজরদারি এবং অনুপ্রবেশ রোধের দায়িত্ব মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের। ফলে এই বিষয়ে দায় এড়ানো যায় না। পাশাপাশি প্রশ্ন তোলা হয়েছে, অনুপ্রবেশ যদি সীমান্ত দিয়ে হয়ে থাকে, তবে কেবল পশ্চিমবঙ্গকেই কেন নিশানা করা হচ্ছে? অন্যান্য সীমান্তবর্তী রাজ্য যেখানে বিজেপি বা তাদের জোটসঙ্গীরা ক্ষমতায় রয়েছে সেখানে কি একই পরিসংখ্যান প্রযোজ্য নয়?
বিতর্কে টানা হয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন-কেও। তৃণমূলের অভিযোগ, বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কতজন সন্দেহভাজন ‘বিদেশি’ শনাক্ত হয়েছেন, তা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কমিশনকে বিজেপির ‘বি-টিম’ বলে কটাক্ষ করে শাসকদলের প্রশ্ন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে আদৌ কোনও নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসৃত হচ্ছে কি না।
বিজেপির পাল্টা দাবি, রাজ্যে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম চলছে এবং রাজনৈতিক স্বার্থে ‘ভোটব্যাঙ্ক’ রক্ষা করা হচ্ছে। গেরুয়া শিবিরের বক্তব্য, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অনুপ্রবেশ রোধ ও অবৈধ বাসিন্দাদের শনাক্ত করা জরুরি। তবে তৃণমূলের বক্তব্য, এই ইস্যু মূলত নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মেরুকরণের উদ্দেশ্যেই উত্থাপন করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনুপ্রবেশ ইস্যু নতুন নয়, তবে ভোটের আগে তা আবার সামনে আসায় স্পষ্ট রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন, অন্যদিকে মানবাধিকার ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দাবি এই দুই মেরুর টানাপোড়েনেই জোরালো হচ্ছে বিতর্ক।
সব মিলিয়ে, ‘১ কোটি অনুপ্রবেশকারী’ দাবি ঘিরে রাজ্যে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।তথ্য-পরিসংখ্যানের লড়াইয়ে কোন পক্ষ কতটা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারে, সেটাই এখন দেখার। আপাতত দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির এই বাকযুদ্ধ যে আগামী দিনে আরও তীব্র হবে, তা বলাই যায়।





