কোচবিহার, ২৬ অক্টোবরঃ বাঁশ, কাগজ, আঠা আর সুতোর বুননে তৈরি হচ্ছে ৩৪ ফুটের এক বিশাল চক্র। তার পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, বিশ্বাস আর সম্প্রীতির গল্প। কোচবিহারের মদনমোহন ঠাকুরের রাস উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এই রাসচক্র নির্মাণের দায়িত্ব আজও সামলে চলেছে একটি মুসলিম পরিবার। ধর্মের পরিচয় নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যই তাঁদের কাছে বড়। সেই পরম্পরার চতুর্থ প্রজন্মের প্রতিনিধি আমিনুর হোসেন এখন ব্যস্ত রাসচক্র তৈরিতে।
কোচবিহারের হরিণচওড়া এলাকায় তোর্সা নদীর তীরে নিজের বাড়িতেই রাসচক্র নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন আমিনুর। দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ড সূত্রে খবর, আগামী ২৪ নভেম্বর মদনমোহন ঠাকুরবাড়িতে শুরু হবে ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব। ওই দিন রাত ৯টায় দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের সভাপতি তথা কোচবিহারের জেলাশাসক রাসচক্র ঘুরিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করবেন। তার আগে প্রায় এক মাস ধরে চলবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রতিটি ধাপে নিখুঁত মাপ, নকশা ও কারুকাজের দিকে নজর রাখতে হচ্ছে আমিনুরকে।
এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় নিয়মও। লক্ষ্মীপুজোর দিন থেকে সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার গ্রহণ করে রাসচক্র নির্মাণে হাত দিয়েছেন তিনি। তিথি ও রীতি মেনে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য। আমিনুরের কথায়, “বড় একটি দায়িত্ব, তাই সমস্ত নিয়ম মেনে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে রাসচক্র বানানোর চেষ্টা করছি। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখারও চেষ্টা চালাচ্ছি।”
এই পরম্পরার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে দুই শতাব্দীরও বেশি পুরনো ইতিহাসে। কথিত ইতিহাস অনুযায়ী, মহারাজা হরেন্দ্র নারায়ণের আমলে ভেটাগুড়িতে শুরু হয়েছিল মদনমোহনের রাস উৎসব। পরে ধলুয়াবাড়ি হয়ে ১৮৯০ সালে বর্তমান মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানেই স্থায়ী রূপ পায় উৎসব। সেই সময় থেকেই রাসচক্র নির্মাণের দায়িত্ব পালন করে আসছে আমিনুরের পরিবার। তাঁর দাদুর বাবা পান মহম্মদ মিয়াঁ এই কাজ শুরু করেছিলেন। পরে দায়িত্ব সামলেছেন তাঁর বাবা আলতাফ মিয়াঁ। এখন সেই উত্তরাধিকার বহন করছেন আমিনুর। টানা চার বছর ধরে তিনিই তৈরি করছেন রাসচক্র।
তবে ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার লড়াই সহজ নয়। এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে আমিনুরের। তাঁর আক্ষেপ, বর্তমান বাজারে কাজের তুলনায় পারিশ্রমিক যথেষ্ট নয়। ফলে আগামী দিনে এই শিল্প এবং পারিবারিক পরম্পরা কতটা ধরে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তবু রাসচক্রের নির্মাণ থেমে নেই। কোচবিহারের এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতির উত্তরাধিকার কোনও এক ধর্মের একার সম্পদ নয়। বিশ্বাসের নিজস্ব পরিসর পেরিয়ে মানুষের শ্রম, নিষ্ঠা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই গড়ে তোলে সম্প্রীতির সেতু। ৩৪ ফুটের রাসচক্র তাই শুধু উৎসবের প্রতীক নয়, কোচবিহারের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যেরও এক জীবন্ত দলিল।





