কোচবিহার, ২০ অক্টোবরঃ আড়ম্বর নয়, আন্তরিকতাই যেখানে দুর্গোৎসবের মূল সুর, সেখানে কোচবিহারের বসু বাড়ির পুজো একেবারেই অন্য রকম। এই পুজোয় দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী রূপ গড়ে তোলেন বাড়ির ছেলে সিদ্ধার্থ বসু। আবার পুজোর সময়ে তিনিই বসেন পুরোহিতের আসনে। চণ্ডীপাঠ থেকে পুজোর নানা আচার সবেতেই পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এমনকী দেবীর ভোগ রান্নার দায়িত্বও সামলান বাড়ির মহিলারা। সব মিলিয়ে এই বাড়ির দুর্গোৎসব যেন পারিবারিক বিশ্বাস, নিষ্ঠা আর আত্মিক বন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ।
আর পাঁচটা বনেদি বাড়ির পুজোর সঙ্গে বসু পরিবারের পুজোর ফারাক এখানেই। প্রতিমা গড়তে বাইরে থেকে কোনও মৃৎশিল্পীকে আনতে হয় না। পুজোর জন্যও প্রয়োজন পড়ে না বাইরের পুরোহিতের। পরিবারের সদস্যরাই নিজেদের হাতে সাজিয়ে তোলেন উৎসবের প্রতিটি পর্ব। নিয়মের চেয়েও এখানে বড় হয়ে ওঠে অন্তরের শ্রদ্ধা, আর সেই শ্রদ্ধাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে নিয়ে চলেছে এই পারিবারিক ঐতিহ্য।
গত প্রায় ২০ বছর ধরে নিজের হাতেই দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করছেন সিদ্ধার্থ। কর্মসূত্রে তিনি কলকাতায় থাকেন। কিন্তু পুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই ছুটি নিয়ে ফিরে আসেন কোচবিহারের বাড়িতে। তার পর শুরু হয় মাটি দিয়ে দেবীর রূপ দেওয়ার কাজ। ধীরে ধীরে খড়, মাটি আর শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠেন মৃন্ময়ী দুর্গা।
বসু বাড়ির পুজোয় প্রতিমা হয় একচালার। রথযাত্রার দিন কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রতিমা তৈরির পর্ব। সেই থেকে পুজোর দিন পর্যন্ত ধাপে ধাপে চলে প্রস্তুতি। পেশায় মৃৎশিল্পী না হয়েও সিদ্ধার্থের হাতের কাজে ফুটে ওঠে শিল্পসত্তা ও নিষ্ঠা। তাঁর তৈরি প্রতিমাই হয়ে ওঠে পরিবারের দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
এই পুজোর আরও একটি বিশেষত্ব রয়েছে দেবীর বাহনে। বসু বাড়ির দুর্গাপ্রতিমার সিংহের মুখ ঘোড়ার মতো। প্রচলিত সিংহমুখী বাহনের থেকে এই রূপ আলাদা হওয়ায় প্রতিমার বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবারের নিজস্ব ঐতিহ্য মেনেই প্রতিমা গড়ার এই রীতি বজায় রয়েছে।
তবে সিদ্ধার্থের ভূমিকা শুধু প্রতিমা তৈরিতেই সীমাবদ্ধ নয়। যে হাতে দেবীর মুখে ফুটে ওঠে রূপ, পুজোর সময়ে সেই হাতেই চলে আরাধনার প্রস্তুতি। প্রতিমাশিল্পীর পরিচয় সরিয়ে রেখে তিনি হয়ে ওঠেন নিষ্ঠাবান পূজারি। চণ্ডীপাঠ, পুজোর আচার এবং দেবীর আরাধনায় ডুবে যান সম্পূর্ণ অন্য এক সত্তায়।
বসু বাড়ির দুর্গোৎসব তাই কেবল দেবী বন্দনার আয়োজন নয়, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সম্মিলিত সাধনা। এখানে শিল্প আর উপাসনা মিলেমিশে একাকার। বাইরের জাঁকজমক নয়, নিজেদের হাতে গড়ে তোলা প্রতিমা, নিজেরাই করা পুজো আর একসঙ্গে উৎসব কাটানোর আনন্দেই পূর্ণতা পায় বসু পরিবারের দুর্গোৎসব।





