কলকাতা, ১৩ অক্টোবরঃ একদিকে মার্কসবাদী দর্শন, অন্যদিকে সনাতনী সংস্কৃতির ধর্মীয় আচার। এই দুইয়ের টানাপোড়েনকে ঘিরেই মঙ্গলবার দুপুরে অন্য রকম দৃশ্যের সাক্ষী থাকল কলকাতার আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। সিপিএমের রাজ্য সদর দপ্তর মুজফ্ফর আহমেদ ভবনের অদূরে বসে গেল চণ্ডীপাঠের আসর। পুজোর আবহে বামেদের রাজনৈতিক ঠিকানার কাছেই এমন ধর্মীয় আয়োজন ঘিরে শুরু হয়েছে চর্চা।
সকাল থেকেই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চণ্ডীপাঠ শুরু হয় বলে জানা গিয়েছে। সেখানে বেশ কয়েকজন মহিলা উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ করেন। মাইক্রোফোনে সেই পাঠের শব্দ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। সাধারণত বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত এই অঞ্চলে আচমকা এমন ধর্মীয় আয়োজন নজর কাড়ে অনেকেরই। সিপিএমের সদর দপ্তরে বিভিন্ন বামপন্থী দলের নেতা-কর্মীদের যাতায়াত লেগেই থাকে। সেই কার্যালয়ের কাছেই চণ্ডীপাঠের আসর বসানোকে নিছক ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
কিন্তু এই আয়োজনের নেপথ্যে কারা? সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। সত্যজিৎ দাস নামে এক ব্যক্তিকে চণ্ডীপাঠের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। আয়োজকদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। তবে অংশগ্রহণকারীদের একাংশের বক্তব্য, সনাতনী ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি বামপন্থীদের মনোভাবের প্রতিবাদ জানাতেই সিপিএমের পার্টি অফিসের সামনে এই আয়োজন। তাঁদের অভিযোগ, বামপন্থীরা বারবার সনাতন ধর্মকে অসম্মান করেছেন। সেই অভিযোগের প্রতিবাদেই প্রকাশ্যে ধর্মাচরণের এই কর্মসূচি।
মার্কসবাদী দর্শনে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। কার্ল মার্কসের ধর্মকে ‘আফিম’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রসঙ্গ টেনে বামপন্থী রাজনীতির সমালোচনা নতুন নয়। সেই প্রেক্ষাপটে আলিমুদ্দিনের অদূরে চণ্ডীপাঠের আয়োজনকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কেউ কেউ। যদিও এই কর্মসূচিকে ঘিরে সিপিএমের তরফে কোনও বড়সড় প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা তথা প্রাক্তন বিধায়ক সুজন চক্রবর্তী বিষয়টিকে কার্যত গুরুত্বহীন বলেই দেখেছেন। তাঁর কটাক্ষ, “এসব করে লাভ নেই। আমাদের এমন বহু কর্মী আছেন, যাঁরা ওঁদের ভালো করে চণ্ডীপাঠ শিখিয়ে দিতে পারবেন।” পাঠের শুদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মঙ্গলবার যা হয়েছে, তা আদৌ সঠিকভাবে চণ্ডীপাঠ কি না, তা সিপিএমের কর্মীরাই বলতে পারবেন।
সব মিলিয়ে, আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের এই চণ্ডীপাঠ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকল না। পুজোর মরশুমে রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয় এবং প্রকাশ্য ধর্মাচরণের অধিকার এই তিনের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে নতুন করে আলোচনার পরিসর তৈরি করল এই আয়োজন।





