কোচবিহার, ৩০ আগস্টঃ এক হাতে বই, অন্য হাতে প্রশ্ন। কখনও প্রেমের কোমল উচ্চারণ, কখনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন প্রতিবাদ। বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির মননে কাজী নজরুল ইসলাম শুধু এক জন কবি নন, তিনি এক চিরজাগ্রত চেতনা। সেই ‘বিদ্রোহী’ কবিকেই এ বার আরও কাছ থেকে চিনবে কোচবিহারের পড়ুয়ারা। মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ হাই স্কুলের প্রধান গেটের সম্মুখে উন্মোচিত হল কাজী নজরুল ইসলামের মূর্তি।
বিদ্যালয়ের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে থাকা কবির মূর্তি যেন প্রতিদিনের পাঠের আগেই পড়ুয়াদের মনে করিয়ে দেবে নজরুলের সেই চিরকালীন প্রশ্ন অন্যায় দেখেও কি নীরব থাকা যায়? তাঁর সাহিত্যজুড়ে যে সাম্য, মানবতা, প্রেম এবং অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা ছড়িয়ে রয়েছে, সেই আদর্শই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এই উদ্যোগ বলে জানানো হয়েছে।
মূর্তি উন্মোচন উপলক্ষে বিদ্যালয় চত্বরে তৈরি হয় বিশেষ সাংস্কৃতিক আবহ। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিধানসভার স্পিকার তথা কোচবিহার দক্ষিণের বিধায়ক রথীন্দ্র বোস, সদর মহকুমাশাসক গোবিন্দ নন্দী-সহ বিশিষ্টজনেরা। ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, পড়ুয়া এবং অন্যান্য আমন্ত্রিতরাও। উপস্থিত সকলে কবির মূর্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
নজরুলের কবিতা মানেই শুধু বিদ্রোহ নয়। তাঁর কলমে যেমন শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আগুন জ্বলে উঠেছে, তেমনই ফুটে উঠেছে মানুষের প্রতি গভীর ভালবাসা। ধর্মের বিভাজনকে অস্বীকার করে তিনি বার বার উচ্চারণ করেছেন মানুষের পরিচয়কেই সবচেয়ে বড় করে দেখার কথা। তাঁর গান, কবিতা, প্রবন্ধ সবেতেই তাই সময় পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক থেকে যায় সাম্য ও সম্প্রীতির সেই সুর।
সেই কারণেই স্কুলের গেটে নজরুলের মূর্তি স্থাপনকে নিছক একটি স্মারক নির্মাণ হিসেবে দেখতে নারাজ উদ্যোক্তারা। তাঁদের বক্তব্য, প্রতিদিন স্কুলে ঢোকার সময় কবিকে দেখবে পড়ুয়ারা। হয়তো কোনও এক দিন কৌতূহল থেকেই হাতে তুলে নেবে ‘বিদ্রোহী’, পড়বে ‘সাম্যবাদী’, চিনবে নজরুলের জীবন ও তাঁর সময়কে। আর সেখান থেকেই তৈরি হবে নতুন করে জানার আগ্রহ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গেট তাই এ দিন হয়ে উঠল এক প্রতীকী পাঠশালা। যেখানে ঘণ্টা বাজার আগেই শুরু হয়ে গেল ইতিহাস ও সাহিত্যের পাঠ। নজরুলের মূর্তি যেন নীরবে বলে গেল-সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং মানুষের পাশে থাকার আদর্শ কখনও পুরনো হয় না।






