খবরিয়া ২৪ ডেস্ক, ২৮ জানুয়ারিঃ ২৪ ঘণ্টাও পেরোয়নি। অথচ এই ক’ঘণ্টাতেই যেন দেশের সঙ্গীতজগৎ থমকে দাঁড়িয়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই একটি ছোট্ট পোস্টে অরিজিৎ সিং জানিয়ে দিলেন তিনি আর সিনেমার প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে কাজ করবেন না। শুভেচ্ছা, কৃতজ্ঞতা আর শেষে একটি লাইন “যাত্রাটা ছিল সুন্দর।” এই কয়েকটি শব্দেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছেন কোটি কোটি শ্রোতা। যেন হঠাৎ করেই থেমে গেল সুর, তাল আর লয়ের এক দীর্ঘ অধ্যায়।
নিজের ব্যক্তিগত এক্স (প্রাক্তন টুইটার) অ্যাকাউন্টে অরিজিৎ স্পষ্ট করেন, এই সিদ্ধান্ত কোনও হঠাৎ আবেগের ফল নয়। বহুদিন ধরেই ভাবনা চলছিল। নিজের স্বভাব নিয়েও অকপট তিনি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। গান তৈরির ধরন বদলানো, সুরের কাঠামো ভাঙা, লাইভে নতুন পরীক্ষা এই স্বাধীনতাই তাঁকে টানে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আনন্দই ক্লান্তিতে পরিণত হয়েছিল। নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতেই তাঁকে অন্য পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
তবে বিদায়ের ঘোষণার মধ্যেও ছিল আশ্বাস। অরিজিৎ জানিয়েছেন, গান বানানো তিনি বন্ধ করছেন না। কিছু অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেগুলো তিনি পূরণ করবেন। এমনকি এই বছরেও নতুন কাজ শ্রোতাদের হাতে পৌঁছতে পারে। মধ্যরাতে তাঁর আরেকটি পোস্ট “আর বলো।” সেখানেই ভেঙে যায় জমে থাকা আতঙ্ক। স্পষ্ট করে দেন, অরিজিনাল গান তিনি গাইবেন, মঞ্চে পারফর্ম করবেন। এক ভক্তের প্রশ্নে তাঁর চেনা জবাব “মিউজিককেই তো ‘হাই’ বলেছি রে পাগলা!”
এই সিদ্ধান্তের অভিঘাত শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের বড় বড় মিউজিক কোম্পানি টি-সিরিজ, সারেগামা, সোনি সবারই অঘোষিত ভরসা ছিলেন অরিজিৎ। তিনি শুধু একজন গায়ক নন, ইন্ডাস্ট্রির মেরুদণ্ড। ২০২৫–২৬ নাগাদ স্পটিফাইয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার তাঁরই ১৬৮ মিলিয়নের বেশি। টেলর সুইফট, এড শিরানের মতো আন্তর্জাতিক তারকাদেরও পিছনে ফেলেছেন। ভারতে টানা সাত বছর সবচেয়ে বেশি স্ট্রিমড শিল্পী, এশিয়ায় একক শিল্পী হিসেবে সর্বাধিক স্ট্রিম সব রেকর্ডই তাঁর দখলে।
একটি গান মানেই হিট এই বিশ্বাসে কোটি কোটি টাকার অঙ্ক ঘুরেছে। লাইভ শো মানেই স্টেডিয়াম ভরা দর্শক, কয়েক ঘণ্টায় কোটি টাকার রাজস্ব। বহু পরিচালকের কাছে তিনি ‘লাকি চার্ম’। সেই চাপই গত পনেরো বছর ধরে বইতে হয়েছে তাঁকে।
অথচ এই মানুষটির বয়স এখনও ৩৯-ও হয়নি। কেরিয়ারের শুরু থেকেই তিনি দেখিয়েছেন নির্মোহতার সাহস। ‘তি আ মো’ গানটি অ্যাশ কিংকে দেওয়া, ‘মোহ মোহ কে ধাগে’ পাপনের জন্য ছেড়ে দেওয়া নিজের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার এমন উদাহরণ বিরল। শিল্পসত্তার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলেই এমন সিদ্ধান্ত সম্ভব।
আজ সেই শিল্পীই শিখরে দাঁড়িয়ে প্লেব্যাককে বিদায় জানালেন। আটটি ফিল্মফেয়ার, দুটি জাতীয় পুরস্কার, ২০২৫ সালের পদ্মশ্রী প্রাপ্তির খাতায় কিছুই কম নেই। তবু প্রশ্ন এর পর কী ? হয়তো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, হয়তো নিজের সঙ্গীতকে নতুন ভাষা দেওয়া।
ইতিমধ্যেই সেই পথের ইঙ্গিত মিলছে। ২০২৩ সালে মায়ের নামে তৈরি ‘অদিতি সুর সাধনালয়’, পাটিয়ালা ঘরানার ক্লাসিক্যাল সংগীতে ডুবে থাকা, অনুষ্কা শঙ্করের সঙ্গে নতুন সাউন্ড নিয়ে পরীক্ষার ভাবনা সব মিলিয়ে স্পষ্ট, তিনি সিনেমার নন, তিনি স্রেফ মিউজিকের মানুষ।
রাজসিংহাসন ছেড়ে দেওয়া মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়। অনেক সময় সেটাই আরও বড় যাত্রার শুরু। অরিজিৎ সিংয়ের এই বিদায় তাই শেষ নয় এ যেন এক নতুন সুরের প্রথম রেওয়াজ।





