কলকাতা,২০ অক্টোবরঃ বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। অথচ সেই উৎসবের আনন্দই এ বার ১৯টি পরিবারের কাছে পরিণত হয়েছে গভীর শোকে। সপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। কেউ এসেছিলেন পরিবারের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে, কেউ এসেছিলেন দূর জেলা থেকে। কিন্তু উৎসবের শেষে আর বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁদের। যে বাড়িতে পুজোর আনন্দে ভরে ওঠার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই স্বজন হারানোর হাহাকার। এই পরিস্থিতিতে শোকাহত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়াতে মঙ্গলবার, নবমীর দিন, জেলায় জেলায় পৌঁছলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আর্থিক সাহায্যও তুলে দেন তিনি। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগের কথাও জানান।
মঙ্গলবার দুপুরে বর্ধমানের মাধবডিহিতে সন্দীপ বেজ ও তাঁর মা টগর বেজের বাড়িতে যান মুখ্যমন্ত্রী। চোরবাগানের মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে মা-ছেলের। অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া সন্দীপকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন টগর। কিন্তু সেই যাত্রাই শেষ হয়ে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। মুখ্যমন্ত্রী যখন তাঁদের বাড়িতে পৌঁছন, তখন পরিবারের সদস্যদের শেষকৃত্য চলছিল। পরিবারের পাশে বসে শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন তিনি।
প্রিয়জনকে হারানোর শোক সামলাতে না পেরে মুখ্যমন্ত্রীর সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যেরা। তাঁদের সান্ত্বনা দিয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দেন শুভেন্দু। রাজ্য সরকারের তরফে বেজ পরিবারের হাতে ২৫ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক এবং দলের জেলা সভাপতি।
চোরবাগান-কাণ্ডের পর থেকেই দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কী ভাবে পুজোমণ্ডপে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি হল, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ঘাটতি ছিল কি না এবং কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এই পরিস্থিতিতে বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠন করে ঘটনার দ্রুত তদন্ত শুরু ও শেষ করার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য, এই বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ সামনে আসা জরুরি। ভবিষ্যতে যাতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে হবে। তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার নেপথ্যে থাকা পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য দায় নির্ধারণের উপর এখন নজর থাকবে।
বেজ পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ফেরার পথে আগের সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শুভেন্দু। অতীতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরেও উৎসবের অনুষ্ঠান চলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আগে এমন ঘটনায় শুনেছেন কখনও অর্থসাহায্য দেওয়া হয়েছে? আগের মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায় কথা বলেন না আজকের মুখ্যমন্ত্রী। আমাদের কর্তব্য শেখাতে হবে না।”
চোরবাগানের দুর্ঘটনায় মৃতদের তালিকায় রয়েছেন কলকাতা ছাড়াও বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা। ফলে শোকের আঁচ ছড়িয়েছে দূরদূরান্তের গ্রামেও। পুজোর মরসুমে আচমকা উপার্জনকারী বা পরিবারের প্রিয় সদস্যকে হারিয়ে দিশাহারা বহু পরিবার। আর্থিক সাহায্য তাঁদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে কিছুটা সহায়ক হলেও, স্বজন হারানোর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। এখন শোকাহত পরিবারগুলির পাশে থাকার আশ্বাসের পাশাপাশি দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায় নির্ধারণের দিকেই তাকিয়ে সকলে।





